আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি আশ্বাস পেয়েছেন যে, ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের হত্যাকাণ্ড বন্ধ হয়েছে এবং ফাঁসির পরিকল্পনাও স্থগিত করা হয়েছে। এ সময় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছে, সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের ফাঁসি দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই।
ট্রাম্পের এই মন্তব্য আসে এমন এক সময়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্র সম্ভাব্য নতুন সংঘাতের আশঙ্কায় মধ্যপ্রাচ্যে কাতারের একটি বিমানঘাঁটি থেকে কিছু কর্মী সরিয়ে নিচ্ছে। বুধবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, তাকে জানানো হয়েছে যে, ইরানে বিক্ষোভকারীদের ওপর হত্যাকাণ্ড বন্ধ হয়েছে এবং পূর্বনির্ধারিত ফাঁসির পরিকল্পনা স্থগিত করা হয়েছে। তিনি জানান, এই বিষয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ সূত্রের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং পরিস্থিতি মনিটর করছেন। তবে মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি নাকচ করেননি।
এরপর ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচি বলেন, ‘ফাঁসির প্রশ্নই আসে না।’ তিনি জানান, জানুয়ারি ৮ থেকে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভে সরকারের কঠোর দমন-পীড়নের পর পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে। তিন দিনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পর পরিস্থিতি শান্ত হয়েছে এবং সরকার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর প্রধান মোহাম্মদ পাকপুর জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করলে তারা পাল্টা জবাব দিতে প্রস্তুত। তিনি বলেন, চলমান বিক্ষোভের পেছনে দায়ী ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরান জবাব দিতে প্রস্তুত। পাকপুর ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীকে ‘ইরানের যুবকদের হত্যাকারী’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ট্রাম্পের মন্তব্য ইরানের প্রতি তার মনোভাব কিছুটা সংযত হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির সিনিয়র ফেলো সিনা তুসি বলেন, ট্রাম্পের দাবি ‘মুখরক্ষা’ হিসেবে দেখা যেতে পারে, যাতে সামরিক হস্তক্ষেপ এড়ানো যায়। তবে এটি পুরোপুরি সংঘাতের সম্ভাবনা শেষ করে না। তিনি আরও বলেন, ট্রাম্প দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল সামরিক সংঘাতে জড়াতে অনীহা বোধ করেন এবং তার মন্তব্য থেকে বোঝা যাচ্ছে, তিনি সীমিত বা নির্বাচিত পদক্ষেপের পথে যেতে পারেন।
এদিকে, ইরানে সম্প্রতি বিক্ষোভের কারণে ১০০ এর বেশি নিরাপত্তা সদস্য নিহত হয়েছেন। বিরোধী কর্মীদের দাবি, নিহতের সংখ্যা আরও বেশি এবং এতে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্টস নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, তারা ২৪০০-এর বেশি বিক্ষোভকারী, ১৫০-এর বেশি নিরাপত্তা সদস্য ও সরকারপন্থীর মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে।
ইরানে প্রায় সম্পূর্ণ টেলিযোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। নেটব্লকস জানিয়েছে, এই ব্ল্যাকআউট ১৪৪ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চলছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, তারা যাচাইকৃত অডিও–ভিডিও প্রমাণ পেয়েছে, যাতে দেখা গেছে নিরাপত্তা বাহিনী শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারী ও পথচারীদের লক্ষ্য করে প্রাণঘাতী আঘাত করেছে।
স্থানীয় প্রতিবেদকরা উল্লেখ করেছেন, জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের সংঘাতের পর দেশজুড়ে মানসিক চাপ বেড়ে গেছে। ডিসেম্বরে স্থানীয় মুদ্রার দরপতন ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দোকানিদের প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু হয়, যা পরে সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের এই নতুন ধাপ পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী অঞ্চলের নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপের বিষয়গুলো নজরদারি ও সম্ভাব্য পদক্ষেপের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।


