আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে দেশটির ঘনিষ্ঠ মিত্র রাশিয়া প্রকাশ্যভাবে কোনো সক্রিয় অবস্থান নেয়নি। মস্কোর এই নীরবতা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নানা আলোচনা ও বিশ্লেষণের জন্ম দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করলে আন্তর্জাতিক পরিসরে রাশিয়ার কূটনৈতিক অবস্থান ও মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। একই সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধ সংক্রান্ত আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান কৌশলগত সমীকরণকেও বিবেচনায় রাখছে মস্কো।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক দুরবস্থাকে কেন্দ্র করে গত ২৮ ডিসেম্বর বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ শুরু হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই এসব আন্দোলন সরকারবিরোধী রূপ নেয়। টানা দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা আন্দোলনের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার দাবি করে তেহরান। এই সময়জুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের আশঙ্কা এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা একযোগে সামাল দিতে হয়েছে ইরানি কর্তৃপক্ষকে।
এমন পরিস্থিতিতে ইরানের অন্যতম কৌশলগত মিত্র রাশিয়ার ভূমিকা ছিল তুলনামূলকভাবে সীমিত। দীর্ঘ সময় ধরে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন কিংবা ক্রেমলিন থেকে ইরানের চলমান গণআন্দোলন নিয়ে কোনো সরাসরি মন্তব্য আসেনি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এটি একটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, কারণ সিরিয়া, ভেনেজুয়েলা কিংবা ইউক্রেনের মতো ইস্যুতে অতীতে মিত্র রাষ্ট্রগুলোর পক্ষে প্রকাশ্য অবস্থান নিতে দেখা গেছে মস্কোকে।
১৩ জানুয়ারি প্রথমবারের মতো ইরান পরিস্থিতি নিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায় রাশিয়া। রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ইরানকে অস্থিতিশীল করতে বাইরের শক্তি সক্রিয় রয়েছে এবং পশ্চিমা দেশগুলো এই সুযোগে দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। বিবৃতিতে সরাসরি কোনো রাষ্ট্রের নাম উল্লেখ না করা হলেও, পশ্চিমা শক্তির ভূমিকা নিয়ে রাশিয়ার দীর্ঘদিনের অবস্থানই এতে প্রতিফলিত হয়েছে। অতীতে সাবেক সোভিয়েত অঞ্চলের কয়েকটি দেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঘটনাকে মস্কো ‘বাইরের মদদপুষ্ট আন্দোলন’ হিসেবে ব্যাখ্যা করে এসেছে।
তবে এই বিবৃতির বাইরে রুশ নেতৃত্বের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে কোনো মন্তব্য না আসা বিশেষভাবে নজরে পড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ইস্যুতে অতিরিক্ত কঠোর বা আগ্রাসী অবস্থান নিলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে বা উত্তেজনা কমানোর প্রক্রিয়ায় ওয়াশিংটনের কাছ থেকে কিছু কৌশলগত ছাড় আদায়ের আশা করছে মস্কো। এ কারণে ইরান প্রশ্নে সরাসরি অবস্থান নেওয়া থেকে বিরত থাকছে রাশিয়া।
এছাড়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে প্রভাব বিস্তার নিয়ে প্রতিযোগিতা থাকলেও, ইরানকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্য সংঘাতে জড়ানোর ঝুঁকি নিতে চায় না ক্রেমলিন। বিশ্লেষকদের মতে, প্রকাশ্য হুমকি বা কঠোর ভাষা ব্যবহার করলে আন্তর্জাতিক মহলে রাশিয়ার অবস্থান দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি কার্যকর কোনো ফলও পাওয়া নাও যেতে পারে।
তবে রাশিয়ার এই নীরবতা যে সম্পূর্ণ সমর্থন প্রত্যাহারের ইঙ্গিত—এমনটি মনে করছেন না আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিশ্লেষকেরা। তাঁদের ধারণা, ইরানের অর্থনীতি পুনর্গঠন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং আঞ্চলিক কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্নে আড়াল থেকেই খামেনি নেতৃত্বাধীন সরকারকে পরামর্শ ও সহায়তা দিয়ে যেতে পারে মস্কো। প্রকাশ্য বিবৃতি বা সামরিক সহযোগিতার পরিবর্তে কূটনৈতিক চ্যানেল ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার মাধ্যমে সম্পর্ক বজায় রাখাই বর্তমানে রাশিয়ার জন্য তুলনামূলকভাবে নিরাপদ কৌশল।
এদিকে ইরানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নানা জল্পনা চলছে। খামেনির শাসনের স্থায়িত্ব, যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য পদক্ষেপ এবং নির্বাসিত সাবেক যুবরাজ রেজা পাহলভির রাজনৈতিক ভূমিকা—এসব বিষয় বিশ্ব রাজনীতির আলোচনায় রয়েছে। এই পরিবর্তনশীল বাস্তবতায় রাশিয়া এখন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও নিজস্ব স্বার্থ সংরক্ষণের কৌশলেই এগোচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


