অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণ বিষয়ে বাংলাদেশের সার্বিক প্রস্তুতি ও অবস্থান মূল্যায়নের লক্ষ্যে চলতি মাসে ঢাকায় আসার কথা ছিল জাতিসংঘের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের। একই সঙ্গে ২১ জানুয়ারি এলডিসি উত্তরণসংক্রান্ত একটি স্বাধীন প্রস্তুতিমূলক মূল্যায়ন প্রতিবেদন উপস্থাপনের সূচিও নির্ধারিত ছিল। তবে সফরের আগেই প্রতিনিধিদলের ঢাকা সফর আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। নতুন কোনো তারিখ এখনো নির্ধারিত হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল ও পঞ্চম এলডিসি সম্মেলনের মহাসচিব রাবাব ফাতিমার নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটির বাংলাদেশ সফরের পরিকল্পনা ছিল। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে এ সময়ে সফরটি না করার সিদ্ধান্ত জানানো হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, আগামী মাসে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রতিনিধিদলটি বাংলাদেশ সফরে আসতে পারে।
এলডিসি থেকে উত্তরণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সম্ভাব্য প্রভাব এবং সাবলীলভাবে উত্তরণ কৌশল বাস্তবায়নের সক্ষমতা মূল্যায়নের উদ্দেশ্যে গত নভেম্বর মাসে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার কাছ থেকে মতামত, তথ্য ও নথিপত্র সংগ্রহ করে জাতিসংঘ। এসব উপাত্তের ভিত্তিতে একটি চূড়ান্ত প্রস্তুতি মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঢাকা সফর স্থগিত হলেও নির্ধারিত সময়েই প্রতিবেদনটি বাংলাদেশে পাঠানো হতে পারে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জাতিসংঘের প্রতিনিধিদলের সফর পিছিয়ে গেলেও উত্তরণসংক্রান্ত প্রক্রিয়া স্থগিত হয়নি। মূল্যায়ন প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী ধাপগুলো পর্যায়ক্রমে এগিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো মনে করছে, এই প্রতিবেদন উত্তরণসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
এদিকে এলডিসি থেকে উত্তরণ পেছানোর দাবি জানিয়ে আসছেন দেশের ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর নেতারা। তাঁদের বক্তব্য, উত্তরণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির ঘাটতি এখনো রয়ে গেছে। এলডিসি থেকে বের হলে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার আওতায় বাংলাদেশের শুল্কমুক্ত ও বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা আর প্রযোজ্য থাকবে না। ফলে রপ্তানি খাতে চাপ তৈরি হতে পারে। বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রাক্কলন অনুযায়ী, উত্তরণের পর দেশের রপ্তানি আয় ৬ থেকে ১৪ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এলডিসি উত্তরণ বিষয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে সব দেশের অবস্থান সমান নয়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে পুরোপুরি ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে না। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্ষেত্রে সদস্যভুক্ত ২৭ দেশের যেকোনো একটি দেশের আপত্তিকে সম্মিলিত বিরোধিতা হিসেবে গণ্য করা হয়, যা উত্তরণ-পরবর্তী বাণিজ্য সুবিধা আলোচনায় প্রভাব ফেলতে পারে।
গত ২৪ আগস্ট দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে ১৬টি সংগঠন একযোগে এলডিসি থেকে উত্তরণ পেছানোর দাবি জানায়। সরকার ইতিমধ্যে এই দাবির বিষয়টি জাতিসংঘকে অবহিত করেছে। তবে এখন পর্যন্ত উত্তরণ পেছানোর বিষয়ে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ইতিবাচক সংকেত পাওয়া যায়নি। একই সময়ে এলডিসি তালিকা থেকে উত্তরণের জন্য প্রস্তুত অন্য দেশগুলোর মধ্যে লাওস ও নেপাল এখনো উত্তরণ পেছানোর কোনো উদ্যোগ নেয়নি।
বর্তমান লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, চলতি বছরের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশ এলডিসি তালিকা থেকে উত্তরণ করার কথা রয়েছে। তবে ব্যবসায়ীরা এই সময়সূচি পরিবর্তনের পক্ষে অনড় অবস্থানে রয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এলডিসি থেকে উত্তরণ ২০২৬ সালেই কার্যকর হবে বলে পূর্বনির্ধারিত সময়সূচি বহাল রয়েছে। উত্তরণ পেছানোর আবেদন অন্তর্বর্তী সরকার করবে না; নির্বাচিত সরকার চাইলে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
এলডিসি উত্তরণ প্রক্রিয়া অনুযায়ী, কোনো দেশ উত্তরণ পেছাতে চাইলে তা প্রথমে কারিগরি কমিটির মাধ্যমে পর্যালোচিত হয়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে উপস্থাপিত হয়। সেখানে অনুমোদনের জন্য সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমর্থন প্রয়োজন হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই প্রক্রিয়া জটিল ও সময়সাপেক্ষ।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ২০১৮ সালে মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং জলবায়ু ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা—এই তিন সূচকে নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করে এলডিসি থেকে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করে। ২০২১ সালের পর্যালোচনার পর জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি ২০২৬ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের সুপারিশ করে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অনুমোদন সাপেক্ষে ওই তারিখেই বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে এলডিসি শ্রেণি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কথা রয়েছে।


