আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভে ব্যাপক সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ধন রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। তিনি সাম্প্রতিক অস্থিরতার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করে দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘অপরাধী’ হিসেবে অভিহিত করেন এবং ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ বন্ধের আহ্বান জানান।
শনিবার দেওয়া এক ভাষণে আয়াতুল্লাহ খামেনি বলেন, সাম্প্রতিক বিক্ষোভে নিহতদের মধ্যে অনেককে অমানবিক ও নৃশংস উপায়ে হত্যা করা হয়েছে। তবে তিনি এসব মৃত্যুর দায় রাষ্ট্রবিরোধী উসকানিদাতা ও সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িত গোষ্ঠীর ওপর চাপান। তার বক্তব্যে বলা হয়, দেশকে অস্থিতিশীল করার লক্ষ্যে বিদেশি শক্তির সহায়তায় কিছু গোষ্ঠী সহিংসতা ছড়াচ্ছে।
খামেনি যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করে বলেন, সাম্প্রতিক অস্থিরতার জন্য ওয়াশিংটনকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য ইরানের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করা। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিদেশি শক্তির চাপ ও হস্তক্ষেপ ইরানের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে।
ইরানে এই বিক্ষোভের সূচনা হয় গত বছরের শেষ দিকে। দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরে চলমান অর্থনৈতিক সংকট, মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে প্রথমে সীমিত পরিসরে প্রতিবাদ শুরু হয়। পরবর্তীতে এসব বিক্ষোভ বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে এবং ধীরে ধীরে তা সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। কোথাও কোথাও বিক্ষোভকারীরা সরাসরি রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং শাসনব্যবস্থার সংস্কারের দাবি তোলে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষণকারী সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। আহত ও আটক ব্যক্তির সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। তবে দেশজুড়ে ইন্টারনেট ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে সীমিত থাকায় প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ও স্বাধীন তথ্য সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে নিহত ও আহতের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
ইরানি কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভকে ‘দাঙ্গা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে জানিয়েছে, এসব আন্দোলন বিদেশি শত্রুদের মদদে সংঘটিত হচ্ছে। সরকারের দাবি, জননিরাপত্তা রক্ষার স্বার্থে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবস্থা নিচ্ছে এবং সহিংসতায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলো অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের অভিযোগ তুলেছে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আগেও ইরানের বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থনের বার্তা দেওয়া হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে সরকারবিরোধী আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সহিংস দমন-পীড়নের ক্ষেত্রে কঠোর প্রতিক্রিয়ার ইঙ্গিত দেন। ইরানের পক্ষ থেকে এই বক্তব্যকে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখানো হয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে বলে বিশ্লেষকদের মত।
ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরানে ইন্টারনেট সংযোগ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ন্যূনতম পর্যায়ে নেমে এসেছে। অনেক এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কার্যত বন্ধ রয়েছে। এর ফলে বিক্ষোভ সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদান ব্যাহত হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিস্থিতি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, তারা এমন তথ্য পেয়েছে যে ইরান সম্ভাব্য হামলার বিকল্প পরিকল্পনা তৈরি করছে। এক বিবৃতিতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ বা স্থাপনায় কোনো ধরনের হামলা হলে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানানো হবে। এ প্রসঙ্গে তেহরানকে সতর্ক করে উত্তেজনা বাড়াতে পারে—এমন পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে, ইরানে চলমান বিক্ষোভ, প্রাণহানি, ইন্টারনেট সীমাবদ্ধতা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পাল্টাপাল্টি বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক চাপ ও কূটনৈতিক উত্তেজনা দেশটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।


