ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক হামলা স্থগিত, কূটনৈতিক তৎপরতায় উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত

ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক হামলা স্থগিত, কূটনৈতিক তৎপরতায় উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

গত সপ্তাহে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক হামলা ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক উত্তেজনা সৃষ্টি হলেও শেষ পর্যন্ত সেই হামলা বাস্তবায়িত হয়নি। সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় দখলদার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানে তাৎক্ষণিক হামলা থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানান। মূলত ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা হামলা মোকাবিলায় পর্যাপ্ত সামরিক প্রস্তুতির অভাব এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনায় রেখে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থির প্রেক্ষাপটে ইরান আগে থেকেই সতর্কবার্তা দিয়ে আসছিল যে, তাদের ভূখণ্ডে কোনো ধরনের হামলা হলে তারা কঠোর জবাব দেবে। ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, এমন পরিস্থিতিতে তারা ইসরায়েলসহ মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালাতে পারে। এই হুমকির কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়, বিশেষ করে আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং সামরিক সরঞ্জামের পর্যাপ্ততা নিয়ে।

মার্কিন প্রশাসনের একাধিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, গত সপ্তাহে ইরানে হামলা না চালানোর অন্যতম প্রধান কারণ ছিল মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পর্যাপ্ত সামরিক উপস্থিতি ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতার ঘাটতি। বিশেষ করে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলা প্রতিহত করার মতো সমন্বিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রস্তুতি তখনো সম্পূর্ণ ছিল না। এ পরিস্থিতিতে ইসরায়েলও এককভাবে ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা আক্রমণ মোকাবিলায় সক্ষম নয় বলে মূল্যায়ন করা হয়।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরেই আকাশ প্রতিরক্ষা ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহতকরণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি ও সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। অতীত অভিজ্ঞতাও এই নির্ভরতার বিষয়টি স্পষ্ট করে। গত বছরের জুনে মধ্যপ্রাচ্যে টানা ১২ দিনব্যাপী সংঘাতে ইরান ইসরায়েলের লক্ষ্যবস্তু করে একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। সে সময় এসব ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে নতুন করে বড় পরিসরের সংঘাত শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সম্পৃক্ততা ছাড়া ইসরায়েলের পক্ষে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে—এমন মূল্যায়নই উঠে আসে সংশ্লিষ্ট মহলে।

ওই প্রেক্ষাপটে গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক উপদেষ্টারা ধারণা করেছিলেন, যেকোনো সময় ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু হতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সামরিক বিকল্পের পাশাপাশি কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেয় ওয়াশিংটন।

এই উত্তেজনা প্রশমনে ইরানের পক্ষ থেকেও কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হয়। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকোফের কাছে একটি খুদেবার্তা পাঠান বলে জানা গেছে। ওই বার্তায় সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের ইঙ্গিত দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো মনে করছে, এই যোগাযোগ পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত রাখতে ভূমিকা রেখেছে এবং তাৎক্ষণিক সামরিক সংঘাত এড়াতে সহায়ক হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান এই উত্তেজনা শুধু দ্বিপক্ষীয় বা ত্রিপক্ষীয় বিষয় নয়; এর প্রভাব গোটা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ওপর পড়তে পারে। তেল সরবরাহ, আঞ্চলিক বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির সঙ্গে এই সংকট গভীরভাবে যুক্ত। ফলে সামরিক পদক্ষেপের আগে কূটনৈতিক বিকল্পকে গুরুত্ব দেওয়া এখনো প্রধান কৌশল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক প্রস্তুতি পুনর্মূল্যায়ন করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ইরানও নিজের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও কূটনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে ইরানকে কেন্দ্র করে সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা আপাতত কমলেও উত্তেজনা পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি, যা ভবিষ্যতে নতুন করে সংকটের আশঙ্কা উড়িয়ে দেয় না।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ