মাদুরোকে আটক অভিযানের আগে ভেনেজুয়েলার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গোপন যোগাযোগ

মাদুরোকে আটক অভিযানের আগে ভেনেজুয়েলার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গোপন যোগাযোগ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার লক্ষ্যে পরিচালিত অভিযানের কয়েক মাস আগে থেকেই দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিওসদাদো কাবেলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গোপন যোগাযোগ চলছিল—এমন তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। অভিযানের পরও এই যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে। বিষয়টি ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সূত্রগুলো জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রশাসনের কর্মকর্তারা কাবেলোর সঙ্গে সরাসরি এবং বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে আলোচনা করেন। এই আলোচনার একটি প্রধান উদ্দেশ্য ছিল—কাবেলোর নিয়ন্ত্রণাধীন নিরাপত্তা বাহিনী ও সরকারপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো যেন বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে ব্যাপক সহিংসতায় না জড়ায়, সে বিষয়ে তাকে সতর্ক করা। যুক্তরাষ্ট্রের আশঙ্কা ছিল, এমন সহিংসতা শুরু হলে দেশটিতে বড় ধরনের অস্থিতিশীলতা তৈরি হতে পারে এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

গত ৩ জানুয়ারি পরিচালিত অভিযানের পর থেকে ভেনেজুয়েলার গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশ এবং সশস্ত্র বাহিনীর ওপর কাবেলোর প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। দীর্ঘদিন ধরে তিনি দেশটির ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুর অন্যতম ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। যুক্তরাষ্ট্র যে মাদক পাচার সংক্রান্ত অভিযোগপত্রকে মাদুরোকে গ্রেপ্তারের আইনি ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করেছিল, সেই একই অভিযোগপত্রে কাবেলোর নামও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে অভিযানের সময় তাকে আটক করা হয়নি, যা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা প্রশ্ন ও আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে।

সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাবেলোর এই যোগাযোগ নতুন নয়। প্রশাসনের শুরু থেকেই এই আলোচনা চলছিল এবং মাদুরোকে আটক করার আগের কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত তা অব্যাহত ছিল। এমনকি মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরও ওয়াশিংটন কাবেলোর সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছে বলে জানা গেছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক রূপরেখা ও ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়েও এই যোগাযোগের একটি অন্তর্নিহিত প্রভাব থাকতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের মূল উদ্বেগ ছিল—কাবেলো যদি তার নিয়ন্ত্রণাধীন বাহিনী মাঠে নামান, তাহলে দেশব্যাপী সহিংসতা ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ডেলসি রদ্রিগেজের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হতো। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কাবেলোর সঙ্গে নীরব কূটনৈতিক যোগাযোগকে অগ্রাধিকার দেয়।

তবে ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও কাবেলোর আলোচনার পরিসর কতটা বিস্তৃত ছিল, কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের সতর্কবার্তা কাবেলো কতটা অনুসরণ করেছেন—সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। কারণ, কাবেলো প্রকাশ্যে বারবার ডেলসি রদ্রিগেজের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছেন এবং বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি তার সমর্থনের কথা জানিয়েছেন।

দিওসদাদো কাবেলো দীর্ঘদিন ধরে ভেনেজুয়েলার দ্বিতীয় সর্বাধিক ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। প্রয়াত প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে তার রাজনৈতিক উত্থান ঘটে। শ্যাভেজের মৃত্যুর পর তিনি নিকোলাস মাদুরোর অন্যতম প্রধান অনুগতে পরিণত হন এবং ক্ষমতাসীন কাঠামোর ভেতরে তার প্রভাব আরও বিস্তৃত হয়। দেশটির রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় তার ভূমিকা দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত।

মানবাধিকার লঙ্ঘন, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং মাদক পাচারের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র কাবেলোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র তাকে ধরিয়ে দিতে ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার পুরস্কার ঘোষণাও করে। তবে কাবেলো বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন এবং সেগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন।

এই গোপন যোগাযোগের তথ্য প্রকাশ পাওয়ার পর ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক কৌশল এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিষয়টি দেশটির অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্য ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কী প্রভাব ফেলবে, তা সময়ের সঙ্গে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ