জাতীয় ডেস্ক
আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সোমবার (১৯ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া একটি ভিডিও বার্তায় তিনি এই আহ্বান জানান। বার্তাটি সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচার করা হয়।
ভিডিও বার্তায় ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের দায়িত্ব এখন জনগণের হাতে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট প্রদান করলে একটি নতুন রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক কাঠামোর দিকে দেশ অগ্রসর হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে গণভোটে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান।
প্রধান উপদেষ্টা তার বক্তব্যে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই লক্ষ্য সামনে রেখেই ইতোমধ্যে কিছু কাঠামোগত সংস্কার গ্রহণ করা হয়েছে এবং আরও গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়েছে।
ড. ইউনূস জানান, দেশের সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি ‘জুলাই সনদ’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এই সনদ বাস্তবায়নের জন্য জনগণের সম্মতি প্রয়োজন, যার উদ্দেশ্যেই গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, গণভোটের মাধ্যমে জনগণ তাদের মতামত জানাতে পারবে এবং সনদের প্রস্তাবগুলো কার্যকর করার সাংবিধানিক ভিত্তি তৈরি হবে।
প্রধান উপদেষ্টা জানান, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনেই গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। তার বক্তব্যে বলা হয়, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়লে রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাঠামোগত পরিবর্তনের পথ উন্মুক্ত হবে। এসব পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচন কমিশন গঠনে সরকার ও বিরোধী দলের যৌথ ভূমিকা নিশ্চিত করা, যাতে নির্বাচন প্রক্রিয়া আরও গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক হয়।
জুলাই সনদের প্রস্তাবিত বিষয়গুলোর মধ্যে আরও উল্লেখ করা হয় যে, সরকার এককভাবে ইচ্ছামতো সংবিধান সংশোধন করতে পারবে না এবং গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে জনগণের সম্মতি বাধ্যতামূলক হবে। পাশাপাশি সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা শক্তিশালী করার লক্ষ্যে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদের গুরুত্বপূর্ণ স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ বিরোধী দল থেকে নির্বাচিত করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
ড. ইউনূস তার বক্তব্যে জানান, সনদ অনুযায়ী একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। এছাড়া বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়টিও প্রস্তাবের অন্তর্ভুক্ত। সংসদে নারীদের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির পাশাপাশি ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় একটি উচ্চকক্ষ গঠনের কথাও সনদে উল্লেখ রয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, মৌলিক অধিকার সুরক্ষাকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রভাষা বাংলার পাশাপাশি বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ভাষাকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীদের রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে ক্ষমা প্রদানের ক্ষেত্রে নির্বাহী ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা নির্ধারণের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সনদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্র পরিচালনার সব ক্ষমতা যেন একজন প্রধানমন্ত্রীর হাতে কেন্দ্রীভূত না থাকে, সে লক্ষ্যে সাংবিধানিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা হবে।
ভিডিও বার্তার শেষাংশে ড. মুহাম্মদ ইউনূস দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিতব্য গণভোটে অংশগ্রহণের মাধ্যমে জনগণ তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী রাষ্ট্র গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি বলেন, গণভোটের ফলাফল ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।


