আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানের প্রতি কঠোর সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন, ইসরায়েলের ওপর কোনো ধরনের হামলা হলে তার জবাব হবে কঠোর ও নজিরবিহীন। সোমবার ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ইসরায়েলের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে দেশটি প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত রয়েছে এবং এমন প্রতিক্রিয়া দেখানো হবে, যা ইরান আগে কখনো প্রত্যক্ষ করেনি।
নেসেটে বক্তব্যকালে নেতানিয়াহু ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও আঞ্চলিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে কথা বলেন। সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে ইসরায়েলকে স্বৈরতন্ত্রের দিকে ঠেলে দেওয়ার যে অভিযোগ উঠেছে, তা নাকচ করে তিনি বলেন, এসব অভিযোগ বাস্তবতাভিত্তিক নয়। বরং সমালোচকদের ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির দিকে নজর দেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানে চলমান রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা সে দেশের শাসনব্যবস্থা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেয়।
ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে নেতানিয়াহু দেশটিতে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ঘটে যাওয়া বিক্ষোভ ও সহিংসতার প্রসঙ্গ তোলেন। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে ইরানে তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে ব্যাপক জনবিক্ষোভ শুরু হয়। জ্বালানি, খাদ্যপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের সংকট থেকে এ আন্দোলনের সূত্রপাত হলেও পরবর্তী সময়ে তা সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। বিভিন্ন শহরে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ ঘটে, যা দ্রুত সহিংস আকার ধারণ করে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি অনুযায়ী, এসব সংঘর্ষ ও সহিংসতায় প্রায় চার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তবে ইন্টারনেট সংযোগ সীমিত বা বন্ধ থাকায় এবং তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় এসব সংখ্যার পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীন যাচাই কঠিন হয়ে পড়েছে। ইরান সরকার এ অস্থিরতার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করে আসছে এবং দাবি করছে, বিদেশি শক্তির উসকানিতেই দেশটির ভেতরে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা হচ্ছে।
নেসেটে দেওয়া বক্তব্যে নেতানিয়াহু মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু, গাজা উপত্যকার ভবিষ্যৎ নিয়েও কথা বলেন। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় প্রস্তাবিত গাজা পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপে তুরস্ক বা কাতারের কোনো নিরাপত্তা বাহিনী সেখানে মোতায়েন করা হবে না। তবে যুদ্ধ-পরবর্তী গাজার প্রশাসনিক ও নির্বাহী ব্যবস্থাপনার জন্য গঠিত একটি বোর্ডে তুরস্ক ও কাতার অন্তর্ভুক্ত থাকবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, এই বোর্ড গাজার ভবিষ্যৎ পরিচালনায় সমন্বয়মূলক ভূমিকা পালন করবে।
গাজা পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ইসরায়েলের প্রধান শর্ত হিসেবে নেতানিয়াহু হামাসকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র করার বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, গাজা উপত্যকাকে সামরিক কার্যক্রমমুক্ত করা ছাড়া সেখানে স্থায়ী নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, যদি কূটনৈতিক বা রাজনৈতিক উপায়ে এই লক্ষ্য অর্জন করা না যায়, তবে ইসরায়েল প্রয়োজন হলে কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নিতেও পিছপা হবে না।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফ গাজা যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত উদ্যোগের দ্বিতীয় ধাপ শুরুর ঘোষণা দেন। এই উদ্যোগের লক্ষ্য হিসেবে যুদ্ধবিরতি সম্প্রসারণ, মানবিক সহায়তা জোরদার এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামো নির্ধারণের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং গাজার নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে এখনো মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া গাজা সংঘাতে এখন পর্যন্ত ৭১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং এক লাখ ৭১ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। দীর্ঘ এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন ইস্যুর পাশাপাশি ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনা পুরো অঞ্চলজুড়ে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দিয়েছে।


