ফিচার ডেস্ক
ভারতীয় সংগীতজগতের প্রখ্যাত শিল্পী আশা ভোঁসলে দীর্ঘ সংগীতজীবনের পাশাপাশি রান্না ও খাবারের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগের জন্যও পরিচিত। সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই ও আবুধাবিতে অবস্থিত তাঁর রেস্তোরাঁ ‘আশা’-তে নতুন হায়দরাবাদী মেনু চালুর আয়োজনকে কেন্দ্র করে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি নিজের জীবন, সংগীত ও খাবারের সঙ্গে সম্পর্কের নানা দিক তুলে ধরেছেন। শিল্পী হিসেবে দীর্ঘ পথচলায় সংগীত যেমন তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে, তেমনি খাবার ও রান্না তাঁর ব্যক্তিগত স্মৃতি ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হয়ে রয়েছে।
সাতবার ফিল্মফেয়ার পুরস্কারপ্রাপ্ত এই শিল্পী একসময় কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করেছিলেন যেন তাঁকে আর প্রতিযোগিতামূলক পুরস্কারের বিবেচনায় না আনা হয়। সংগীতকে পেশা নয়, বরং জীবনের স্বাভাবিক প্রবাহ হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই তাঁর এই অবস্থান। সাক্ষাৎকার চলাকালে রেস্তোরাঁর নতুন মেনু উদ্বোধনের আনুষ্ঠানিকতা থাকলেও সহজেই বোঝা যায়, সংগীতই তাঁর জীবনের মূল সুর। প্রতিটি উপলক্ষেই গান যেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁর কণ্ঠে ধরা দেয়। সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী বাঙালি জানতে পেরে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে একটি বাংলা গান গেয়ে শোনান, যা উপস্থিত কর্মীদের মনোযোগও আকর্ষণ করে।
সংগীতের পাশাপাশি রান্নার সঙ্গেও আশা ভোঁসলের সম্পর্ক গভীর ও আবেগপূর্ণ। তিনি জানান, রান্না করা তাঁর কাছে কেবল দৈনন্দিন কাজ নয়, বরং স্মৃতি ও যত্নের প্রকাশ। রেকর্ডিং শেষে বাড়ি ফিরে ছেলে আনন্দের ক্লান্তি সংক্রান্ত প্রশ্নের মধ্যেই লুকিয়ে থাকত ক্ষুধার ইঙ্গিত, যা বুঝেই তিনি রান্নাঘরে চলে যেতেন। তাঁর ভাষায়, ছেলের ইচ্ছাই ছিল মায়ের রান্না একদিন বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। সেই ভাবনা থেকেই ‘আশা’ রেস্তোরাঁর যাত্রা শুরু।
দুবাই ও আবুধাবির ‘আশা’ রেস্তোরাঁয় পরিবেশিত প্রতিটি মেনুর পেছনে রয়েছে আলাদা গল্প ও অভিজ্ঞতা। নতুন সংযোজিত ‘রয়্যাল হায়দরাবাদি টেবিল’-এর সূত্রপাত ১৯৬২ সালে। বোন লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে একটি কনসার্টের পর হায়দরাবাদে প্রথমবার নিজামি খাবারের স্বাদ গ্রহণ করেন তিনি। সেই অভিজ্ঞতা তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। নতুন শহরে গেলে স্থানীয় রান্নার রেসিপি সংগ্রহ করার অভ্যাস থেকেই তিনি হায়দরাবাদি বিরিয়ানি ও বিখ্যাত বেগুনের তরকারি রান্না করতে শেখেন, যা পরবর্তীতে তাঁর রেস্তোরাঁর মেনুতেও স্থান পায়।
শৈশব থেকেই খাবার ও রান্না তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পিতা পণ্ডিত দীননাথ মঙ্গেশকরের মৃত্যুবার্ষিকীতে স্মরণানুষ্ঠানে বড় পরিসরে রান্নার আয়োজনের অভিজ্ঞতা তাঁকে রান্নার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ করে তোলে। ছোট বয়সে পরিবারের প্রয়োজনে রাতভর রান্নার সেই অভ্যাসই ধীরে ধীরে তাঁর খাদ্যাভ্যাস ও রান্নার দক্ষতায় প্রভাব ফেলে। এই অভিজ্ঞতার কারণেই নতুন মেনু চালুর সময় তাঁকে প্রায়ই রেস্তোরাঁর শেফদের সঙ্গে রান্নায় অংশ নিতে দেখা যায়।
প্রতিযোগিতামূলক রেস্তোরাঁ ব্যবসায় ‘আশা’ প্রায় ২২ বছর ধরে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে। শিল্পী ও তাঁর ছেলে আনন্দের যৌথ উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই রেস্তোরাঁ শুধু ব্যক্তিগত স্মৃতির প্রতিফলন নয়, বরং একটি ধারাবাহিক রন্ধন ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব করছে। নিয়মিত গ্রাহকদের প্রতিক্রিয়া ও প্রশংসা নতুন নতুন খাবার সংযোজনে তাঁকে উৎসাহ জোগায়। হায়দরাবাদী খাবারের পর ভবিষ্যতে রাজস্থানি খাবার যুক্ত করার পরিকল্পনার কথাও তিনি জানান।
দীর্ঘ সংগীতজীবনে কণ্ঠের যত্ন নিতে গিয়ে অনেক প্রিয় খাবার ত্যাগ করতে হয়েছে তাঁকে। দই ও অল্প বয়সেই আইসক্রিম ছাড়ার অভিজ্ঞতা তাঁর পেশাগত শৃঙ্খলার দিকটি তুলে ধরে। সংগীতজীবনের স্মরণীয় মুহূর্ত প্রসঙ্গে তিনি বিশেষভাবে আর ডি বর্মনের সঙ্গে কাজের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর গানগুলোর জটিলতা ও নতুন ধরনের কণ্ঠ প্রয়োগ তাঁকে শিল্পী হিসেবে নতুনভাবে গড়ে তুলেছিল বলে তিনি মনে করেন।
সংগীত ও খাবার—এই দুইয়ের সমন্বয়েই আশা ভোঁসলের জীবন ও দর্শন গড়ে উঠেছে, যা ব্যক্তিগত স্মৃতি, সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।


