আন্তর্জাতিক ডেস্ক
গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থানের বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে তীব্র সমালোচনা উঠেছে। ব্রিটিশ লিবারেল ডেমোক্র্যাট দলের নেতা ও সংসদ সদস্য এড ডেভি এই ইস্যুতে ট্রাম্পের বক্তব্য ও মনোভাবকে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক রীতিনীতির পরিপন্থী হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ট্রাম্প শক্তি ও চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে মিত্র দেশগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তার করতে আগ্রহী—এমন ধারণা আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগজনক।
মঙ্গলবার যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্দেশে দেওয়া এক বক্তব্যে এড ডেভি গ্রিনল্যান্ড সংক্রান্ত মার্কিন অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার বক্তব্যে উঠে আসে, গ্রিনল্যান্ড একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হলেও এটি ডেনমার্কের অধিভুক্ত এবং ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ। এই প্রেক্ষাপটে গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে কোনো ধরনের চাপ বা একতরফা দাবি ন্যাটো জোটের ঐক্য এবং ইউরোপীয় নিরাপত্তার জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এড ডেভির বক্তব্যে আরও বলা হয়, ট্রাম্পের অতীত মন্তব্য ও অবস্থান থেকে এমন একটি বার্তা পাওয়া যায় যে, তিনি কৌশলগত বা অর্থনৈতিক স্বার্থের ক্ষেত্রে মিত্র দেশগুলোর সার্বভৌমত্বকে গুরুত্ব দিতে অনাগ্রহী। গ্রিনল্যান্ড ইস্যুর পাশাপাশি ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি এবং ন্যাটোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলার বিষয়গুলোও এই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। তার মতে, এসব বক্তব্য ও পদক্ষেপ ইউরোপ এবং বৈশ্বিক রাজনীতিতে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করছে।
গ্রিনল্যান্ড দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে আসছে। উত্তর আটলান্টিক ও আর্কটিক অঞ্চলে এর অবস্থান সামরিক ও বাণিজ্যিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আর্কটিক অঞ্চলে নতুন নৌপথ ও প্রাকৃতিক সম্পদের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গ্রিনল্যান্ডের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। এর আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে গ্রিনল্যান্ড কেনার আগ্রহ প্রকাশ করলে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড কর্তৃপক্ষ তা প্রত্যাখ্যান করে। সেই সময় বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
ব্রিটিশ সংসদে দেওয়া বক্তব্যে এড ডেভি বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে ‘চ্যালেঞ্জিং’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বড় শক্তিগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ ও কূটনৈতিক সংযম এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন। অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও সাধারণ মানুষের জীবিকার ওপর আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্তের সরাসরি প্রভাব পড়ে—এ কথা উল্লেখ করে তিনি যুক্তরাজ্য সরকারের প্রতি মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় জোরদারের আহ্বান জানান।
এই প্রসঙ্গে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রনীতি নিয়েও আলোচনা উঠে আসে। পার্লামেন্টে প্রশ্ন তোলা হয়, গ্রিনল্যান্ড ইস্যু এবং ন্যাটো জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে যুক্তরাজ্য কী ধরনের অবস্থান নেবে এবং ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে কীভাবে সমন্বয় করবে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতৃত্বে পরিবর্তন বা সম্ভাব্য নীতিগত অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাজ্যের কূটনৈতিক প্রস্তুতি কতটা কার্যকর—সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে বিতর্ক কেবল একটি ভূখণ্ডের প্রশ্ন নয়; এটি আর্কটিক অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার, নিরাপত্তা কাঠামো এবং মিত্র দেশগুলোর পারস্পরিক আস্থার সঙ্গেও জড়িত। যুক্তরাজ্যের সংসদে এড ডেভির বক্তব্য এই ইস্যুতে ইউরোপীয় রাজনীতিকদের উদ্বেগের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এই জটিল প্রেক্ষাপটে আগামী দিনে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় দেশগুলো এবং ন্যাটো জোটের মধ্যে কূটনৈতিক সমঝোতা কীভাবে গড়ে ওঠে, সেদিকেই নজর থাকবে বিশ্ব রাজনীতির পর্যবেক্ষকদের।


