ইরান সরকারি হিসেবে ৩১ হাজার নিহতের হিসাব প্রকাশ করল

ইরান সরকারি হিসেবে ৩১ হাজার নিহতের হিসাব প্রকাশ করল

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ইরানের সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ও সহিংসতায় মৃতের সংখ্যা নিয়ে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিক হিসাব প্রকাশ করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের খবরে জানানো হয়েছে, সহিংসতা দমনের অভিযানে মোট ৩ হাজার ১১৭ জন নিহত হয়েছেন।

বুধবার (২১ জানুয়ারি) ইরানের বার্তা সংস্থা প্রেস টিভিতে প্রচারিত এক বিবৃতিতে দেশটির মার্টির্স ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে ২ হাজার ৪২৭ জন বেসামরিক নাগরিক এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য রয়েছে। এই তথ্য অনুযায়ী বাকি অংশ নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য বা অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) এই সংখ্যাকে অনেক বেশি উল্লেখ করেছে। সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিক্ষোভ চলাকালে অন্তত ৪ হাজার ৫১৯ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ৪ হাজার ২৫১ জন বিক্ষোভকারী, ১৯৭ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য, ৩৫ জন ১৮ বছরের কম বয়সী এবং ৩৮ জন পথচারী রয়েছেন, যারা সরাসরি বিক্ষোভ বা নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। সংস্থা আরও জানিয়েছে, অতিরিক্ত ৯ হাজার ৪৯ জনের মৃত্যুর তথ্য যাচাইয়ের অপেক্ষায় রয়েছে।

ইরানে গত ডিসেম্বরে মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে প্রথম বিক্ষোভ শুরু হয়। শুরুতে দোকানদাররা রাস্তায় নেমেছিলেন, পরে তা দ্রুত সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। ইরানি কর্তৃপক্ষ এই বিক্ষোভকে ‘সন্ত্রাসী’ কর্মকাণ্ড হিসেবে আখ্যা দিয়ে দাবি করেছে, যে সহিংসতা যুক্তরাষ্ট্রের উসকানিতে সংঘটিত হয়েছে।

তবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও পর্যবেক্ষকরা বিক্ষোভ দমন নীতিকে কেন্দ্র করে সরকারের সমালোচনা জানিয়েছেন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ইরানি নিরাপত্তা বাহিনী রাস্তায় এবং ভবনের ছাদে অবস্থান নিয়ে ধাতব গুলিভর্তি রাইফেল ও শটগান ব্যবহার করেছে। সংস্থার দাবি, এসব অস্ত্র অনেক ক্ষেত্রে নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের মাথা ও বুকে লক্ষ্য করে ছোড়া হয়েছে।

নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান উত্তেজনাও বেড়েছে। মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রকাশনায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সতর্ক করে বলেন, যদি ইরানের ওপর হামলা হয়, তেহরান আর সংযম দেখাবে না। তিনি উল্লেখ করেছেন, ২০২৫ সালের জুনে যে সংযম দেখানো হয়েছিল, এবার তা দেখানো হবে না এবং হামলার ক্ষেত্রে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী সর্বশক্তি দিয়ে জবাব দেবে। আরাঘচি আরও জানিয়েছেন, পূর্ণমাত্রার সংঘর্ষ দীর্ঘস্থায়ী এবং ভয়াবহ হবে, যার প্রভাব পুরো অঞ্চলে এবং বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের ওপর পড়বে।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, যদি ইরান কখনো তার হত্যার চেষ্টা করে, তাহলে দেশটিকে ‘পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে ফেলা হবে’। মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ—সৌদি আরব, কাতার ও ওমান—ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ না নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে, যদিও ট্রাম্প সেই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছেন।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই সংঘর্ষ ও উত্তেজনার প্রভাব শুধু ইরান বা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং মধ্যপ্রাচ্য ও আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ