গাজায় ইসরাইলি বিমান হামলায় তিন সাংবাদিক নিহত

গাজায় ইসরাইলি বিমান হামলায় তিন সাংবাদিক নিহত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর বিমান হামলায় অন্তত তিনজন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। বুধবার (২৩ জানুয়ারি) গাজা শহরের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আল-জাহরা এলাকায় এ হামলার ঘটনা ঘটে। গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগ জানিয়েছে, সাংবাদিকদের বহনকারী একটি বেসামরিক যানকে লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালানো হলে ঘটনাস্থলেই তিনজনের মৃত্যু হয়।

বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগের প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়, হামলার পর নিহত সাংবাদিকদের মরদেহ মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ এলাকায় অবস্থিত আল-আকসা শহীদ হাসপাতালে পাঠানো হয়। নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে মোহাম্মদ সালাহ কাশতা, আবদুল রউফ শাআত এবং আনাস ঘনেইম হিসেবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে একজন আন্তর্জাতিক একটি সংবাদ সংস্থার সঙ্গে ফ্রিল্যান্স ভিত্তিতে কাজ করতেন, যদিও হামলার সময় তিনি ওই সংস্থার কোনো আনুষ্ঠানিক দায়িত্বে নিযুক্ত ছিলেন না।

গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আল-জাহরা এলাকায় যে যানটি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয় সেটি একটি বেসামরিক গাড়ি ছিল এবং সেখানে কোনো সামরিক তৎপরতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে সংস্থাটি আরও জানায়, হামলার আগে ওই এলাকায় কয়েকজন সাংবাদিক একটি ত্রাণ কার্যক্রমের দৃশ্য ধারণ করছিলেন। তাদের দাবি, একটি মিশরীয় ত্রাণ সংস্থার সহায়তা বিতরণের তথ্যচিত্র ধারণের উদ্দেশ্যে সাংবাদিকরা ড্রোন ব্যবহার করছিলেন।

অন্যদিকে, ইসরাইলি সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, মধ্য গাজা উপত্যকায় হামাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি ড্রোন পরিচালনাকারী কয়েকজন ‘সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে’ লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। সেনাবাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ড্রোনটি তাদের জন্য তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা হুমকি তৈরি করছিল। এ কারণে নির্ধারিত অনুমোদন প্রক্রিয়া অনুসরণ করে হামলাটি পরিচালনা করা হয়। তবে ড্রোনটির সঙ্গে হামাসের সম্পৃক্ততা কীভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে বা নিহত ব্যক্তিরা কীভাবে ওই কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

এই ঘটনায় গাজায় কর্মরত সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে গাজা উপত্যকায় চলমান সংঘাতের মধ্যে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের ঝুঁকির মুখে পড়ার ঘটনা বাড়ছে বলে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন দাবি করে আসছে। সংঘাতপূর্ণ এই অঞ্চলে সাংবাদিকরা প্রায়ই বিমান হামলা, গোলাবর্ষণ এবং স্থল অভিযান চলাকালে জীবনহানির আশঙ্কায় কাজ করছেন।

গাজা উপত্যকা বর্তমানে চরম মানবিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। খাদ্য, চিকিৎসা ও জরুরি ত্রাণসামগ্রীর তীব্র ঘাটতির পাশাপাশি নিয়মিত সামরিক অভিযানের কারণে বেসামরিক জনগণের জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে ত্রাণ কার্যক্রম ও মানবিক পরিস্থিতি তুলে ধরতে সাংবাদিকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে সশস্ত্র সংঘাতের সময় সাংবাদিকদের বেসামরিক ব্যক্তি হিসেবে সুরক্ষা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কর্মরত সাংবাদিকরা সরাসরি যুদ্ধে অংশ না নিলে তাদের ওপর হামলা নিষিদ্ধ বলে বিবেচিত হয়। তবে বাস্তব পরিস্থিতিতে এ ধরনের সুরক্ষা কতটা কার্যকরভাবে মানা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

গাজার বেসামরিক কর্তৃপক্ষ এই হামলার স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে হামলা হলে তা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের শামিল। একই সঙ্গে তারা সংঘাতপূর্ণ এলাকায় সংবাদ সংগ্রহে নিয়োজিত ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর ভূমিকা কামনা করেছে।

এই হামলার মাধ্যমে গাজা উপত্যকায় চলমান সংঘাতে সাংবাদিকদের প্রাণহানির সংখ্যা আরও বাড়ল। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষকদের মতে, সংঘাতের প্রকৃত চিত্র বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে গিয়ে যারা কাজ করছেন, তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত না হলে তথ্যপ্রবাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

রাজনীতি শীর্ষ সংবাদ