গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে শুল্ক স্থগিত করল যুক্তরাষ্ট্র, সমঝোতার কাঠামোর ইঙ্গিত

গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে শুল্ক স্থগিত করল যুক্তরাষ্ট্র, সমঝোতার কাঠামোর ইঙ্গিত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

গ্রিনল্যান্ডকে কেন্দ্র করে ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি থেকে সরে এসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্ভাব্য একটি সমঝোতার কাঠামোর কথা জানিয়েছেন। তার ঘোষণার ফলে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়ার কথা থাকা শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত স্থগিত করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ডেনমার্ক, গ্রিনল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

বুধবার (২১ জানুয়ারি) সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনের ফাঁকে ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটের সঙ্গে বৈঠকের পর ট্রাম্প এই অবস্থান জানান। এর আগে কয়েক সপ্তাহ ধরে গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর বিরুদ্ধে শুল্ক আরোপের সম্ভাবনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছিল। সাম্প্রতিক ঘোষণায় সেই উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো মনে করছে।

ট্রাম্প বলেন, পশ্চিমা আর্কটিক অঞ্চলের মিত্র দেশগুলো গ্রিনল্যান্ড নিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে পৌঁছাতে পারে। তার ভাষায়, এই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা স্বার্থ, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়া ও চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব সীমিত রাখার সুযোগ তৈরি হবে। তিনি এটিকে এমন একটি কাঠামো হিসেবে উল্লেখ করেন, যেখানে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের স্বার্থ রক্ষা পাবে।

গ্রিনল্যান্ড উত্তর আটলান্টিক ও আর্কটিক অঞ্চলে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি ভূখণ্ড। এটি ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হলেও নিজস্ব সরকার ও সংসদ রয়েছে। বরফাচ্ছাদিত এই দ্বীপে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভূরাজনৈতিক আগ্রহ বেড়েছে, বিশেষ করে বিরল খনিজ, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং সামরিক কৌশলগত অবস্থানের কারণে। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই সেখানে নিরাপত্তা অবকাঠামো বজায় রেখেছে, যার মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কীকরণ ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত।

ন্যাটোর এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, ডেনমার্ক, গ্রিনল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনা চলমান থাকবে। আলোচনার মূল লক্ষ্য হবে গ্রিনল্যান্ডে রাশিয়া বা চীনের কোনো ধরনের অর্থনৈতিক কিংবা সামরিক উপস্থিতি বিস্তার ঠেকানো। তবে আলোচনার নির্দিষ্ট সময়সূচি বা স্থান এখনো চূড়ান্ত হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এই আলোচনায় অংশ নিতে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং দূত স্টিভ উইটকফকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ট্রাম্প।

ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোক্কে রাসমুসেন এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ডেনমার্কের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দেশের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা বজায় রাখা এবং গ্রিনল্যান্ডের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে সম্মান করা। তিনি আরও বলেন, এ ধরনের সংবেদনশীল বিষয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্য বিতর্কের মাধ্যমে নয়, বরং নীরব ও দায়িত্বশীল কূটনীতির মাধ্যমে সমাধান হওয়া উচিত।

দাভোসে দেওয়া এক বক্তব্যে ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেন, গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র কোনো ধরনের সামরিক শক্তি প্রয়োগ করবে না। তার ভাষায়, তিনি বলপ্রয়োগের পক্ষে নন এবং আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান চান। এই মন্তব্যের মাধ্যমে সামরিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কা নাকচ করা হয়েছে, যা ইউরোপীয় মিত্রদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ট্রাম্পের অবস্থান পরিবর্তনের পর যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক বাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে। শেয়ারবাজারে বড় ধরনের উত্থান বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে ইউরোপীয় কূটনীতিকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সুর নরম হওয়ায় তাৎক্ষণিক উত্তেজনা কমলেও গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা, নিরাপত্তা কাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে মৌলিক প্রশ্নগুলোর এখনো চূড়ান্ত সমাধান হয়নি।

গ্রিনল্যান্ডের সরকার এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি। পর্যবেক্ষকদের ধারণা, আসন্ন আলোচনাগুলোতে আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক আইনসংক্রান্ত বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে। আলোচনার অগ্রগতি ও ফলাফলের ওপরই নির্ভর করবে, গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় মিত্রদের সম্পর্ক কোন দিকে এগোবে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ