যুক্তরাষ্ট্রের ‘নিউ গাজা’ পরিকল্পনা প্রকাশ, যুদ্ধবিধ্বস্ত ভূখণ্ড পুনর্গঠনের রূপরেখা উপস্থাপন

যুক্তরাষ্ট্রের ‘নিউ গাজা’ পরিকল্পনা প্রকাশ, যুদ্ধবিধ্বস্ত ভূখণ্ড পুনর্গঠনের রূপরেখা উপস্থাপন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ফিলিস্তিনের গাজা ভূখণ্ডকে যুদ্ধোত্তর বাস্তবতায় নতুনভাবে পুনর্গঠনের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র একটি বিস্তৃত পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। ‘নিউ গাজা’ নামে পরিচিত এই পরিকল্পনায় গাজাকে ধাপে ধাপে আধুনিক আবাসিক, শিল্প ও পর্যটন অঞ্চলে রূপান্তরের রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের এক অনুষ্ঠানে এই পরিকল্পনার বিভিন্ন দিক উপস্থাপন করা হয়।

উপস্থাপিত নথি ও মানচিত্র অনুযায়ী, গাজার প্রায় ২১ লাখ মানুষের জন্য নতুন আবাসন, কৃষিজমি, শিল্পাঞ্চল এবং অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী এলাকায় উঁচু ভবনের সারি, উপকূলীয় পর্যটন অঞ্চল এবং আধুনিক নগর সুবিধা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পরিকল্পনায় রাফাহ এলাকাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যেখানে নতুন আবাসিক প্রকল্প, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও চিকিৎসা কেন্দ্র গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে।

এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র নতুন একটি ‘বোর্ড অব পিস’ গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। বোর্ডটির দায়িত্ব হবে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলমান সংঘাতের অবসান ঘটানো এবং গাজা পুনর্গঠনের সার্বিক কার্যক্রম তদারকি করা। বোর্ডের কাজের সময়সীমা প্রাথমিকভাবে দুই বছর নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গাজা পুনর্গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে বক্তব্য দেন। তিনি গাজার ভৌগোলিক অবস্থান ও উপকূলীয় এলাকার উন্নয়ন সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে বলেন, এই অঞ্চল ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বসবাসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তার বক্তব্যে গাজাকে পুনর্গঠনের মাধ্যমে একটি নতুন উন্নয়ন মডেল গড়ে তোলার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

পরিকল্পনা প্রণয়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখা ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার অনুষ্ঠানে গাজার বর্তমান বাস্তবতা তুলে ধরেন। তিনি জানান, সাম্প্রতিক যুদ্ধের ফলে সেখানে বিপুল পরিমাণ ধ্বংসস্তূপ জমে আছে, যা অপসারণ করা পুনর্গঠনের প্রথম ধাপ। তার মতে, গাজায় ব্যবহৃত বিপুল গোলাবারুদ ও ধ্বংসযজ্ঞের কারণে অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলেও এটি বাস্তবায়নযোগ্য।

যুক্তরাষ্ট্রের মাস্টার প্ল্যানে গাজার উপকূলীয় এলাকায় প্রায় ১৮০টি উঁচু ভবন নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি শিল্প অঞ্চল, তথ্যপ্রযুক্তি কেন্দ্র, আধুনিক কারখানা, পার্ক, কৃষিজমি এবং খেলাধুলার সুবিধা অন্তর্ভুক্ত থাকবে। মিসর সীমান্তের কাছাকাছি একটি নতুন সমুদ্রবন্দর ও বিমানবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। এছাড়া মিসর ও ইসরায়েল সীমান্তসংলগ্ন একটি বিশেষ সীমান্ত পারাপার ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা পণ্য ও মানুষের চলাচল সহজ করবে।

পুনর্গঠন কার্যক্রম চারটি ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রথম ধাপে রাফাহ এলাকা থেকে কাজ শুরু করে ধীরে ধীরে উত্তরের দিকে গাজা শহরের দিকে অগ্রসর হওয়ার কথা বলা হয়েছে। মানচিত্রে মিসর ও ইসরায়েল সীমান্ত বরাবর একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলকে নিরাপত্তা এলাকারূপে চিহ্নিত করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, গাজায় পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এই এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনীর উপস্থিতি থাকবে।

নিউ রাফাহ প্রকল্পের আওতায় এক লাখের বেশি স্থায়ী আবাসন, প্রায় ২০০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ৭৫টি চিকিৎসাকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। যুদ্ধের আগে গাজার দক্ষিণাঞ্চলের এই শহরে প্রায় দুই লাখ ৮০ হাজার মানুষ বসবাস করত। সাম্প্রতিক সংঘাত ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের ফলে শহরটি প্রায় সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বর্তমানে এটি ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণাধীন।

কুশনারের মতে, দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে নিউ রাফাহ নির্মাণ শেষ করা সম্ভব। তিনি জানান, ধ্বংসস্তূপ অপসারণের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে ‘নিউ গাজা’ একটি নতুন অর্থনৈতিক কেন্দ্র ও শিল্পনির্ভর অঞ্চলে পরিণত হতে পারে, যা কর্মসংস্থান ও উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি করবে।

আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ওয়াশিংটনে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজনের কথাও জানানো হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন দেশ গাজা পুনর্গঠনে আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দিতে পারে এবং বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের সুযোগ তুলে ধরা হবে। একই সঙ্গে গাজাকে নিরস্ত্রীকরণের প্রক্রিয়া শুরু করার কথা বলা হয়েছে, যা নতুন প্রশাসনিক কাঠামোর মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে বলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

তবে হামাস বরাবরই স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগে অস্ত্র ত্যাগের বিষয়ে অনীহা প্রকাশ করে আসছে। এই প্রেক্ষাপটে গাজার ভবিষ্যৎ পুনর্গঠন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা ও অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ