আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আফগানিস্তানে ন্যাটো বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যকে ‘অপমানজনক ও বিভ্রান্তিকর’ বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। শুক্রবার লন্ডনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ন্যাটো সেনাদের অবদান খাটো করে দেখানো শুধু ঐতিহাসিকভাবে ভুল নয়, বরং মিত্র দেশগুলোর ত্যাগ ও দায়িত্ববোধের প্রতিও অসম্মানজনক। এ ধরনের বক্তব্যের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের ক্ষমা চাওয়া উচিত বলেও তিনি মত প্রকাশ করেন।
প্রধানমন্ত্রী স্টারমার বলেন, আফগানিস্তানে ন্যাটো বাহিনীর উপস্থিতি ও কার্যক্রম আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সেখানে দায়িত্ব পালনকারী সেনারা সম্মুখসারিতে থেকেই ঝুঁকি নিয়েছেন। সেই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে দেওয়া কোনো মন্তব্য স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, “আমি যদি এমন কোনো ভুল বক্তব্য দিতাম, তাহলে অবশ্যই সংশোধন করে ক্ষমা চাইতাম।”
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর এই প্রতিক্রিয়া আসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক বক্তব্যের পর, যেখানে তিনি দাবি করেন যে আফগানিস্তান যুদ্ধে ন্যাটো সেনারা মূলত সামনের সারি এড়িয়ে কিছুটা পেছনে অবস্থান করেছিল। এই বক্তব্য প্রকাশের পরপরই যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক ও সামরিক মহলে সমালোচনার ঝড় ওঠে।
ব্রিটিশ সরকারও আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রাম্পের বক্তব্যকে ‘ভুল তথ্যভিত্তিক’ বলে অভিহিত করেছে। শুক্রবারের শুরুতে সরকারের এক বিবৃতিতে বলা হয়, আফগানিস্তানে ন্যাটো বাহিনী, বিশেষ করে ব্রিটিশ সেনারা, সম্মুখসারিতে থেকেই লড়াই করেছে এবং দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সরকারের মতে, এই বাস্তবতা অস্বীকার করা ইতিহাসের বিকৃতি ছাড়া কিছু নয়।
কিয়ার স্টারমার তার বক্তব্যে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ঐতিহ্যবাহী ও কৌশলগত সম্পর্কের কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা দীর্ঘদিনের এবং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে সেই সম্পর্কের ভিত্তি হতে হবে পারস্পরিক সম্মান ও সঠিক তথ্যের ওপর। মিত্রদের অবদান খাটো করে দেখালে সেই সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন।
আফগানিস্তান যুদ্ধের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার পর ন্যাটোর যৌথ নিরাপত্তা নীতির আওতায় আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু হয়। সেই অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি যুক্তরাজ্যসহ একাধিক ন্যাটো সদস্য দেশ সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়। ব্রিটিশ বাহিনী দীর্ঘ সময় ধরে আফগানিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ ও নিরাপত্তা কার্যক্রমে যুক্ত ছিল।
এই সংঘাতে যুক্তরাজ্যের বড় ধরনের মানবিক ও সামরিক ক্ষয়ক্ষতি হয়। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, আফগানিস্তানে দায়িত্ব পালনকালে ৪৫৭ জন ব্রিটিশ সেনা প্রাণ হারান এবং আরও বহু সেনা গুরুতর আহত হন। এ ছাড়া যুদ্ধের আর্থিক ব্যয় ও দীর্ঘমেয়াদি মানসিক প্রভাবও যুক্তরাজ্যের সমাজে স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ন্যাটো মিত্রদের ভূমিকা নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য শুধু অতীতের ঘটনাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে না, বরং ভবিষ্যৎ সামরিক জোট ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ন্যাটোর ভূমিকা এবং সদস্য দেশগুলোর পারস্পরিক আস্থা বজায় রাখতে দায়িত্বশীল ও তথ্যনির্ভর বক্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই প্রেক্ষাপটে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে মিত্রদের অবস্থান স্পষ্ট করার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে এটি যুক্তরাষ্ট্রসহ ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর নেতাদের প্রতি বার্তা দিচ্ছে যে, সামরিক ইতিহাস ও ত্যাগের বিষয়ে দায়িত্বশীল ভাষা ব্যবহার করা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জন্য অপরিহার্য।


