ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো হামলাকে সর্বাত্মক যুদ্ধ হিসেবে বিবেচনার ঘোষণা, উচ্চ সতর্কতায় তেহরান

ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো হামলাকে সর্বাত্মক যুদ্ধ হিসেবে বিবেচনার ঘোষণা, উচ্চ সতর্কতায় তেহরান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরীসহ ভারী সামরিক নৌযান মোতায়েনের প্রেক্ষাপটে ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, দেশটির বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের হামলাকে সর্বাত্মক যুদ্ধ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, হামলার ধরন বা মাত্রা যাই হোক না কেন, তেহরান এবার আর সংযম দেখাবে না এবং কঠোরতম প্রতিক্রিয়া জানাবে। ফলে চলমান উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আরও বেড়েছে।

ইরানের ওই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক প্রস্তুতি তেহরান গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান আশা করছে এই প্রস্তুতি সরাসরি যুদ্ধের জন্য নয়, তবে সম্ভাব্য সব ধরনের পরিস্থিতির জন্য দেশটির সশস্ত্র বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে। এ কারণে ইরানে সামরিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। তিনি বলেন, সীমিত, সার্জিক্যাল বা আকাশ হামলা— যেকোনো আকারের আক্রমণকেই ইরান পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ হিসেবে গণ্য করবে এবং সে অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া জানাবে।

এই বক্তব্যের মাধ্যমে ইরান কার্যত জানিয়ে দিয়েছে যে অতীতে যেমন সীমিত প্রতিক্রিয়া বা কূটনৈতিক সংযম দেখানো হয়েছিল, এবার সেই নীতি আর অনুসরণ করা হবে না। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এটি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য একটি কড়া বার্তা, যেখানে ইরান নিজের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং পাল্টা হামলার প্রস্তুতি স্পষ্টভাবে তুলে ধরছে।

এমন পরিস্থিতিতে ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) প্রধান কমান্ডার মেজর জেনারেল মোহম্মদ পাকপৌর আরও কঠোর ভাষায় সতর্কবার্তা দিয়েছেন। এক লিখিত বিবৃতিতে তিনি বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র ইসরায়েলের কোনো বিভ্রান্তিতে থাকা উচিত নয়। তাঁর মতে, অতীতে সৃষ্ট সংঘাত থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা স্মরণে রাখলে বর্তমান পরিস্থিতির গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হবে।

জেনারেল পাকপৌর বলেন, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী বর্তমানে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি প্রস্তুত। তিনি দাবি করেন, দেশের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের নির্দেশ বাস্তবায়নের জন্য আইআরজিসি ও অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরা সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে। তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত দেওয়া হয়, ইরানের সামরিক বাহিনী কেবল প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানেই নেই, বরং প্রয়োজনে তাৎক্ষণিক ও শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া জানাতে সক্ষম।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নৌবহর মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন এবং ইরানের এই পাল্টা অবস্থান অঞ্চলটির নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। গাজা যুদ্ধ, লেবানন সীমান্তে উত্তেজনা, ইয়েমেন ও সিরিয়ায় বিভিন্ন পক্ষের সংঘাত— এসবের মধ্যেই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সংঘর্ষের আশঙ্কা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ও পারস্য উপসাগর এলাকায় সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

ইরান দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, তারা সরাসরি যুদ্ধ চায় না; তবে দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়লে শক্ত প্রতিক্রিয়া জানাতে পিছপা হবে না। সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলো সেই অবস্থানকে আরও কঠোরভাবে উপস্থাপন করছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও কূটনৈতিক ভাষায় ইরানকে সংযত থাকার আহ্বান জানানো হলেও সামরিক প্রস্তুতি অব্যাহত রয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি যে কোন মুহূর্তে নতুন মাত্রায় পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা। উভয় পক্ষের কঠোর অবস্থান ও সামরিক প্রস্তুতির কারণে ভুল বোঝাবুঝি বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে। ফলে কূটনৈতিক উদ্যোগ ও সংলাপের প্রয়োজনীয়তা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ