ভারত-বাংলাদেশ নদী পানির বণ্টন সংকট তীব্র হচ্ছে

ভারত-বাংলাদেশ নদী পানির বণ্টন সংকট তীব্র হচ্ছে

অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে অভিন্ন নদ-নদীর পানির ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করতে ভারতকে একাধিকবার কূটনৈতিক চ্যানেল ও বিভিন্ন মাধ্যমে চিঠি দিয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রাপ্য পানি সরবরাহ এবং যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) বিভিন্ন পর্যায়ের বৈঠক আয়োজনের আহ্বান সত্ত্বেও দিল্লির পক্ষ থেকে এখনও কার্যকর কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, যৌথ নদী কমিশন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে এসব তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, যৌথ নদী কমিশন ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা সূত্রে জানা যায়, ভারত উজানের দেশ হিসেবে অভিন্ন নদীর পানিকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করছে। শুষ্ক মৌসুমে অবৈধভাবে পানি প্রত্যাহার এবং বর্ষায় হঠাৎ বাঁধ খুলে দেওয়া হয়ে থাকে, যার ফলে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। সরকার বিভিন্ন চ্যানেলে একাধিকবার বিষয়টি তুলে ধরলেও উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় বসতে ভারতকে রাজি করানো যাচ্ছে না।

জেআরসি সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে জেআরসির সর্বশেষ কারিগরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বাংলাদেশের ১০ সদস্যের প্রতিনিধিদল পদ্মা/গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন ছাড়াও ধরলা, দুধকুমার, গোমতী, খোয়াই, মনু ও মুহুরীসহ ১৪টি নদীর পানিবণ্টন নিয়ে আলোচনা করে। বৈঠকে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক আইন ও রীতি মেনে অভিন্ন সব নদীর পানি ব্যবহারের ওপর জোর দেয়, কিন্তু বৈঠকের পর থেকে দিল্লি সব ধরনের যোগাযোগ এড়িয়ে যাচ্ছে।

গঙ্গা নদীর পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরের দিকে শেষ হওয়ার কারণে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, চুক্তি বলবৎ থাকাকালীন সময়েও বাংলাদেশ ন্যায্য পানি পাচ্ছে না। তিস্তা নদীর পানিবণ্টন নিয়ে কার্যত কোনো আলোচনা হয়নি। উল্টো, উজানে অবৈধ বাঁধ নির্মাণ করে ভারত নদীর পানি প্রায় পুরোপুরি প্রত্যাহার করছে। এছাড়া কুশিয়ারা, ফেনী ও তিতাসসহ সীমান্তবর্তী অন্তত সাতটি নদীতে ভারত মারাত্মক ক্ষতিকর বর্জ্য ফেলছে।

আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটির সভাপতি মোস্তফা কামাল মজুমদার জানান, ভারত পানি স্বার্থের কারণে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। তিনি উল্লেখ করেন, বর্ষায় বাঁধ খুলে ফসল ধ্বংস এবং শুষ্ক মৌসুমে পানি আটকে দিয়ে কৃষি ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পদ্মা ও তিস্তা সহ প্রায় সব নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা না পাওয়ায় নদীগুলো ক্রমশ শুকিয়ে যাচ্ছে।

ফারাক্কা চুক্তি অনুযায়ী ১ থেকে ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশ ৬৭,৫১৬ কিউসেক পানি পাওয়ার কথা থাকলেও এবার তা প্রদান করা হয়নি। ফারাক্কা ব্যারাজসহ গঙ্গা অববাহিকায় সাতটি ক্যানেলের মাধ্যমে প্রায় ৪০ হাজার কিউসেক পানি অবৈধভাবে সরানো হচ্ছে। ভারত ভাগীরথী নদীর ওপর ৩৯ কিলোমিটার দীর্ঘ ফিডার ক্যানেল ও উত্তর প্রদেশে নতুন বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে পানি নিয়ন্ত্রণ করছে। এতে হুগলী নদীর নাব্য বৃদ্ধি এবং বিস্তীর্ণ এলাকায় সেচ সুবিধা বাড়ানো হচ্ছে, কিন্তু বাংলাদেশের প্রাপ্য পানি কমছে।

তিস্তা নদীর পানি সংকটও মারাত্মক। শুষ্ক মৌসুমে স্বাভাবিকভাবে যেখানে ন্যূনতম ১০,০০০ কিউসেক পানি পাওয়ার কথা, সেখানে মাত্র ২০০ কিউসেক প্রবাহিত হচ্ছে। ১৯৮৭ সাল থেকে ভারত একতরফাভাবে তিস্তার পানি প্রত্যাহার করে আসছে। তিস্তা নদীর দুদেশ সীমান্ত এলাকায় অবৈধ বাঁধ নির্মাণের কারণে পানি প্রবাহ হ্রাস পাচ্ছে।

কুশিয়ারা নদীর ক্ষেত্রেও চুক্তি স্বাক্ষরের পরও ভারত নানা অজুহাতে বাংলাদেশকে পানি উত্তোলনের অনুমতি দিচ্ছে না। ফলে সিলেটসহ নদীর তীরবর্তী এলাকায় কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পাম্পহাউসগুলো অকেজো হয়ে পড়েছে। পানি কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের কৃষি ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ভারতের একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহারের কারণে বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্যে মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। তিনি জানান, সরকার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে এবং গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধির বিষয়ে করণীয় নির্ধারণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে ভারতকে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে চাপ দিতে হবে।

পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পানি বণ্টন নিয়ে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক স্তরে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া না হলে দেশের কৃষি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে।

অর্থ বাণিজ্য শীর্ষ সংবাদ