অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
দেশের সোনার বাজারে দামের অস্থিরতা অব্যাহত রয়েছে। দাম কমানোর ঘোষণা কার্যকর হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আবার নতুন করে মূল্য বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ভালো মানের সোনার দাম ভরিতে দুই লাখ ৫৫ হাজার টাকা ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস) শনিবার থেকে সারা দেশে এই নতুন দাম কার্যকর করেছে।
বাজুসের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে দুই লাখ ৫৫ হাজার ৬১৭ টাকা, যা দেশের বাজারে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। একই সঙ্গে ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার দাম ধরা হয়েছে দুই লাখ ৪৪ হাজার ১১ টাকা। ১৮ ক্যারেটের সোনার দর নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি ভরি দুই লাখ ৯ হাজার ১৩৬ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির সোনার দাম এক লাখ ৭১ হাজার ৮৬৯ টাকা।
এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে ভরিতে তিন হাজার ১৪৯ টাকা কমিয়ে ২২ ক্যারেটের সোনার দাম দুই লাখ ৪৯ হাজার ৩১৮ টাকায় নামানোর ঘোষণা দিয়েছিল বাজুস। তবে সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার আগেই পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়। শুক্রবার দুপুর সোয়া ১২টার মধ্যেই নতুন করে দাম বাড়ানোর ঘোষণা আসে, যা ক্রেতা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
বাজুস এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, স্থানীয় বাজারে তেজাবি সোনার (র’ গোল্ড) মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে দাম পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। সংগঠনটির দাবি, আগের দফায় দাম কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার মূল্য নিম্নমুখী ছিল। তবে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বিশ্ববাজারে দামে উল্লম্ফন ঘটে, যার প্রভাব দেশের বাজারে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে জরুরি বৈঠক ডেকে নতুন মূল্য সমন্বয় করা হয়।
সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দামের দ্রুত পরিবর্তন এখন দেশের বাজারকে সরাসরি প্রভাবিত করছে। বিশেষ করে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা সোনার বাজারকে আরও অস্থির করে তুলছে। ব্যবসায়ীদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চলমান যুদ্ধাবস্থা ও মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ায় নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনার প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম দ্রুত বাড়ছে, যার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে সোনার দামে যে ওঠানামা দেখা যাচ্ছে, তা স্বল্পমেয়াদে স্থিতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা কম। চলতি বছর এখন পর্যন্ত দেশের বাজারে সোনার দাম সমন্বয় করা হয়েছে মোট ১২ বার। এর মধ্যে ৯ বার দাম বেড়েছে এবং মাত্র তিনবার কমানো হয়েছে। এই পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যায়, মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতাই তুলনামূলকভাবে বেশি।
গত বছরের চিত্র আরও স্পষ্টভাবে অস্থিরতার ইঙ্গিত দেয়। ২০২৫ সালে সোনার দাম মোট ৯৩ দফা পরিবর্তন করা হয়েছিল। এর মধ্যে ৬৪ বার দাম বাড়ানো হয় এবং ২৯ বার কমানো হয়। বিশ্লেষকদের মতে, এত ঘন ঘন মূল্য সমন্বয় বাজারে স্থিতিশীলতার অভাবকে তুলে ধরে এবং দীর্ঘমেয়াদে ভোক্তা ও ব্যবসায়ী উভয়ের জন্যই চাপ সৃষ্টি করে।
ক্রেতাদের একটি বড় অংশের অভিযোগ, দামের এই দ্রুত পরিবর্তনের কারণে তারা কেনার সঠিক সময় নির্ধারণ করতে পারছেন না। আবার ব্যবসায়ীরাও বলছেন, প্রতিদিন বা কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দামের বড় পরিবর্তন হলে ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ও মজুত ব্যবস্থাপনায় সমস্যা দেখা দেয়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম মূলত নির্ভর করছে বৈশ্বিক সুদের হার, মুদ্রাস্ফীতি, ডলারের অবস্থান এবং ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর। এসব ক্ষেত্রে বড় কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন না এলে দেশের সোনার বাজারেও টেকসই স্বস্তি আসার সম্ভাবনা কম। ফলে আগামী দিনগুলোতেও সোনার দামে অস্থিরতা অব্যাহত থাকতে পারে বলে তারা মনে করছেন।


