অন্য পেশা থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণে পথচলা: বাংলাদেশের প্রখ্যাত পরিচালকদের জীবন ও কর্ম

অন্য পেশা থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণে পথচলা: বাংলাদেশের প্রখ্যাত পরিচালকদের জীবন ও কর্ম

বিনোদন ডেস্ক

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে বহু খ্যাতিমান নির্মাতার উত্থান ঘটেছে ভিন্ন ভিন্ন পেশা থেকে। শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা, সাহিত্যচর্চা, সরকারি চাকরি কিংবা শিল্পকলার মতো ক্ষেত্র থেকে আসা এসব ব্যক্তিত্ব পরবর্তীতে চলচ্চিত্রকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করে দেশীয় সিনেমায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তাঁদের জীবনপথ ও কর্মধারা বাংলাদেশের চলচ্চিত্র বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।

প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা কাজী জহির চলচ্চিত্রে আসার আগে ছিলেন নটর ডেম কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক। শিক্ষকতা ছেড়ে তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণে যুক্ত হন এবং ১৯৬৫ সালে উর্দু ভাষার চলচ্চিত্র ‘বন্ধন’ পরিচালনার মাধ্যমে চলচ্চিত্র জগতে আত্মপ্রকাশ করেন। পরবর্তীতে তিনি চিত্রা ফিল্মস লিমিটেড নামে নিজস্ব প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে ‘ময়নামতি’, ‘অবুঝ মন’ ও ‘বধূ বিদায়’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৮৩ সালে তিনি পুরান ঢাকার নাগর মহল সিনেমা হল অধিগ্রহণ করে ‘চিত্রা মহল’ নামে পুনরায় চালু করেন। এছাড়া বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রযোজক ও পরিবেশক সমিতির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন।

খান আতাউর রহমান চলচ্চিত্রে আসার আগে সংবাদ পাঠক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৫০ সালে তিনি করাচিতে রেডিও পাকিস্তানে সংবাদ পাঠক হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীতে লন্ডনে গিয়ে বিবিসিতে কাজ করার পাশাপাশি গায়ক ও অভিনেতা হিসেবেও যুক্ত ছিলেন। দেশে ফিরে তিনি সাংবাদিকতা ও বেতারকেন্দ্রিক বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হন। ১৯৫৯ সালে উর্দু চলচ্চিত্র ‘জাগো হুয়া সাভেরা’-তে অভিনয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে প্রবেশ করেন। এরপর তিনি পরিচালক হিসেবে ‘অনেক দিনের চেনা’ দিয়ে যাত্রা শুরু করেন এবং ‘সাতভাই চম্পা’, ‘সুজন সখী’ ও ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’সহ বহু জনপ্রিয় চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন।

সুভাষ দত্তের চলচ্চিত্র জীবন শুরু হয় পোস্টার শিল্পী হিসেবে। পঞ্চাশের দশকে তিনি একটি চলচ্চিত্র প্রচার সংস্থায় কাজ শুরু করেন এবং ১৯৫৬ সালে দেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’-এর পোস্টার ডিজাইন করেন। পরবর্তীতে তিনি অভিনয় ও পরিচালনায় যুক্ত হন। তাঁর পরিচালিত ‘সুতরাং’ চলচ্চিত্রটি তাঁকে নির্মাতা হিসেবে পরিচিত করে তোলে। এরপর ‘সবুজ সাথী’, ‘স্বামী-স্ত্রী’, ‘বসুন্ধরা’সহ বহু চলচ্চিত্র তিনি নির্মাণ করেন।

সাহিত্যিক আমজাদ হোসেন লেখালেখির মাধ্যমে সৃজনশীল জীবনের সূচনা করেন। কবিতা ও ছোটগল্প লেখার পাশাপাশি তিনি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্য রচনা করেন। চলচ্চিত্রে তাঁর আগমন ঘটে অভিনেতা হিসেবে, পরে সহকারী পরিচালক ও পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। ‘আগুন নিয়ে খেলা’, ‘জুলেখা’, ‘নয়নমনি’ ও ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’সহ তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্রগুলো বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।

এহতেশাম কর্মজীবনের শুরুতে রেলওয়েতে ট্রাফিক কন্ট্রোলার হিসেবে কাজ করেন এবং পরবর্তীতে সামরিক বাহিনীতে যুক্ত হন। ষাটের দশকে চলচ্চিত্রে প্রবেশ করে তিনি প্রযোজক ও পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করেন। ‘চান্দা’, ‘রাজধানীর বুকে’ ও ‘চাঁদনী’সহ তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্রগুলো ব্যবসাসফল হয়। তিনি একাধিক জনপ্রিয় অভিনেতা-অভিনেত্রীকে চলচ্চিত্রে পরিচিত করে তোলেন।

জহির রায়হান সাহিত্যিক ও সাংবাদিক হিসেবে পরিচিতি লাভের পর চলচ্চিত্রে যুক্ত হন। সাংবাদিকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করে তিনি পরে সহকারী পরিচালক হিসেবে চলচ্চিত্রে কাজ করেন। ১৯৬১ সালে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন এবং ‘জীবন থেকে নেয়া’সহ একাধিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, যা রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

নারায়ণ ঘোষ মিতা মঞ্চনাটক ও অভিনয়ের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে যুক্ত ছিলেন। পরে তিনি চলচ্চিত্রে পরিচালক ও প্রযোজক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। তাঁর নির্মিত ‘লাঠিয়াল’ চলচ্চিত্রের জন্য তিনি প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ পরিচালক ও প্রযোজকের স্বীকৃতি পান।

চাষী নজরুল ইসলাম সরকারি চাকরি ছেড়ে চলচ্চিত্রে যুক্ত হন। পোস্ট সর্টার হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি তিনি মঞ্চ ও বেতারে অভিনয় করতেন। ১৯৭২ সালে ‘ওরা ১১ জন’ নির্মাণের মাধ্যমে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। আজিজুর রহমানও চলচ্চিত্রে আসেন শিল্পকলার পটভূমি থেকে। তিনি ব্যানার শিল্পী হিসেবে কাজ শুরু করে পরবর্তীতে পরিচালক হিসেবে ‘ছুটির ঘণ্টা’সহ একাধিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন।

ভিন্ন পেশা থেকে আসা এসব নির্মাতার জীবনপথ বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পকে সমৃদ্ধ করেছে এবং দেশীয় সংস্কৃতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

বিনোদন শীর্ষ সংবাদ