অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০২৬ থেকে ২০২৮ সময়কালের জন্য ভারতের ওপর অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা বা জেনারালাইজড সিস্টেম অব প্রেফারেন্স (জিএসপি) স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে ইউরোপের বাজারে ভারতের রপ্তানিপণ্যের একটি বড় অংশ বাড়তি শুল্কের আওতায় পড়বে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এই সিদ্ধান্ত দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্য কাঠামোতে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে এবং স্বল্পমেয়াদে বাংলাদেশের জন্য কিছু প্রতিযোগিতামূলক সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ভারতের ইউরোপমুখী রপ্তানির প্রায় ৮৭ শতাংশ পণ্যে শুল্কহার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য ও কিছু হালকা শিল্পপণ্যে শুল্কের চাপ বাড়বে। ইউরোপীয় আমদানিকারকদের জন্য এতে ভারতীয় পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাবে, যা তাদের বিকল্প উৎস অনুসন্ধানে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ একটি সম্ভাব্য বিকল্প সরবরাহকারী হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
বর্তমানে বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘এভরিথিং বাট আর্মস’ (ইবিএ) সুবিধার আওতায় রয়েছে, যার ফলে অস্ত্র ও গোলাবারুদ ছাড়া সব পণ্যে শুল্ক ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার পাচ্ছে। একই ধরনের তৈরি পোশাকপণ্যে যেখানে ভারতকে গড়ে ১০ থেকে ১২ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে, সেখানে বাংলাদেশ শুল্ক ছাড়াই ইউরোপের বাজারে পণ্য সরবরাহ করতে পারছে। মূল্য সংবেদনশীল তৈরি পোশাক খাতে এই শুল্ক পার্থক্য ক্রেতাদের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে ইউরোপের কিছু ক্রেতা প্রতিষ্ঠান তাদের অর্ডারের একটি অংশ ভারত থেকে বাংলাদেশে স্থানান্তর করার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিস্থিতিতে স্বল্পমেয়াদে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে অর্ডার বৃদ্ধি, কারখানার সক্ষমতা ব্যবহার বাড়া এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের গতি কিছুটা বাড়তে পারে। তবে এই সুবিধাকে দীর্ঘমেয়াদি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ বাংলাদেশ নিজেই ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে ইবিএ সুবিধা প্রত্যাহার হলে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের শুল্ক সুবিধাও কমে আসবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের ক্ষেত্রে জিএসপি সুবিধা স্থগিত হওয়ার ফলে যে প্রভাব দেখা যাচ্ছে, তা বাংলাদেশের জন্য এক ধরনের সতর্ক সংকেতও বহন করে। শুল্ক সুবিধা হারালে রপ্তানি প্রতিযোগিতা কতটা দ্রুত ও গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, ভারতের বর্তমান অভিজ্ঞতা তার একটি উদাহরণ। যদিও পোশাক খাতে বাংলাদেশের তুলনামূলক সক্ষমতা রয়েছে, তবে অন্যান্য শিল্পপণ্যে ভারতের জায়গা পূরণ করা বাংলাদেশের জন্য সহজ নয়। খনিজসম্পদ, যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক দ্রব্য কিংবা ইস্পাতশিল্পে ভারতের উৎপাদন পরিসর ও বৈচিত্র্য বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বিস্তৃত। এসব খাতে ইউরোপীয় আমদানিকারকরা বাংলাদেশকে পূর্ণ বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করবে—এমন সম্ভাবনা সীমিত।
এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম (সিবিএএম) ধাপে ধাপে কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার সব রপ্তানিকারক দেশ নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। কার্বন নিঃসরণ বেশি এমন শিল্পে অতিরিক্ত শুল্ক বা ব্যয় আরোপ করা হলে উৎপাদন খরচ বাড়তে পারে। বাংলাদেশ যদি সময়মতো টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থা, জ্বালানি দক্ষতা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ না বাড়ায়, তাহলে ভবিষ্যতে ইউরোপের বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
নীতিনির্ধারক ও বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের ওপর ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিএসপি স্থগিতাদেশ বাংলাদেশের জন্য একটি সীমিত সময়ের কৌশলগত সুযোগ তৈরি করেছে। এই সময়ের মধ্যে ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করা, নতুন ক্রেতা ধরে রাখা এবং বাজার বৈচিত্র্য বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী শুল্ক কাঠামো মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি বা জিএসপি প্লাস সুবিধা অর্জনের বিষয়ে কূটনৈতিক ও নীতিগত তৎপরতা জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, স্বল্পমেয়াদে রপ্তানি বাড়ার সম্ভাবনা থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, পরিবেশগত মান নিশ্চিতকরণ এবং বাণিজ্য কূটনীতিকে শক্তিশালী করতে না পারলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রপ্তানিও একই ধরনের চাপের মুখে পড়তে পারে।


