বিশ্বকাপ বর্জনের আহ্বান ঘিরে নতুন বিতর্ক, বিপরীতে ইনফান্তিনোর ঐক্যের বার্তা

বিশ্বকাপ বর্জনের আহ্বান ঘিরে নতুন বিতর্ক, বিপরীতে ইনফান্তিনোর ঐক্যের বার্তা

ক্রীড়া প্রতিবেদক

ফুটবল বিশ্বকাপ ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ফিফার সাবেক সভাপতি সেপ ব্লাটার যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বকাপ বর্জনের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি, কঠোর অভিবাসন নীতি এবং সাম্প্রতিক সহিংস ঘটনার প্রেক্ষাপটে সেখানে গিয়ে বিশ্বকাপ উপভোগ করা নিরাপদ ও যুক্তিযুক্ত নয়। ব্লাটারের এই বক্তব্য ফুটবলপ্রেমী ও সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা ও প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে।

বিশ্বকাপ আয়োজনকে ঘিরে সাধারণত খেলোয়াড়দের মাঠের পারফরম্যান্স, দর্শকদের উৎসবমুখর উপস্থিতি এবং বৈশ্বিক মিলনমেলার চিত্রই সামনে আসে। কিন্তু এবারের আসরের ক্ষেত্রে টুর্নামেন্ট শুরুর প্রায় পাঁচ মাস আগেই বয়কট বা বর্জন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। সাবেক ফুটবল প্রশাসক, আইনজীবী ও সংগঠকদের বক্তব্যে এই বিতর্ক ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।

সেপ ব্লাটার সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক মন্তব্যে বিশ্বকাপকে ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ হিসেবে উল্লেখ করলেও যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে তা সরাসরি উপভোগ না করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, স্টেডিয়ামে গিয়ে খেলা দেখার চেয়ে টেলিভিশনের সামনে বসে ম্যাচ উপভোগ করাই নিরাপদ ও যুক্তিসংগত হতে পারে। ব্লাটারের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে চলমান সামাজিক অস্থিরতা এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি বিশ্বকাপের মতো বড় আন্তর্জাতিক আয়োজনের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করছে না।

ব্লাটার তাঁর বক্তব্যে সুইস আইনজীবী মার্ক পিথের সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারের সঙ্গে একমত পোষণ করেন। পিথ জানুয়ারির শুরুতে মিনিয়াপলিসে এক বিক্ষোভ চলাকালে ইমিগ্রেশন এজেন্টদের গুলিতে রেনি গুড নামের এক বিক্ষোভকারীর মৃত্যুর ঘটনাকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁর মতে, এ ধরনের ঘটনা সমর্থকদের যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। এর পাশাপাশি গত সপ্তাহে অ্যালেক্স প্রিতি নামের এক মার্কিন নাগরিকের মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হলে বিতর্ক আরও তীব্র হয়।

এই প্রসঙ্গে জার্মান ফুটবল ফেডারেশনের সহসভাপতি ওকে গটলিশও বর্জন প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেন। তিনি জানান, বর্তমান বাস্তবতায় বিশ্বকাপ বয়কটের বিষয়টি নিয়ে গুরুত্ব সহকারে ভাবার সময় এসেছে। তাঁর বক্তব্যে ফুটবল প্রশাসনের একটি অংশের উদ্বেগ স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে, যা শুধু ক্রীড়া আয়োজন নয়, বরং আয়োজক দেশের সামগ্রিক পরিবেশকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে।

তবে সাবেক নেতাদের এই অবস্থানের সম্পূর্ণ বিপরীতে অবস্থান নিয়েছেন বর্তমান ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। তিনি বিশ্বকাপকে বিভাজনের নয়, বরং ঐক্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। ইনফান্তিনোর ভাষ্য অনুযায়ী, ফুটবলপ্রেমীরা বিশ্বকাপে যেতে চান এবং একসঙ্গে বসে ম্যাচ উপভোগ করতে আগ্রহী। তাঁর মতে, ফুটবল সবসময় মানুষকে একত্রিত করেছে এবং ভবিষ্যতেও করবে। তাই বর্জনের আহ্বানের পরিবর্তে একসঙ্গে বিশ্বকাপ উপভোগ করার দিকেই মনোযোগ দেওয়া উচিত।

বিশ্বকাপ ঘিরে এই বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা ও অভিবাসন নীতি। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময়ে প্রণীত ও পরবর্তীতে কার্যকর থাকা কিছু নিষেধাজ্ঞা এখনো বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। আফ্রিকার ফুটবল শক্তি সেনেগাল ও আইভরি কোস্ট দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকায় এসব দেশের সমর্থকদের জন্য ভিসা পাওয়া জটিল হয়ে উঠেছে। একইভাবে ইরান ও হাইতির নাগরিকদের ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নানা ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, নিরাপত্তা উদ্বেগ ও ভিসা জটিলতা যদি অব্যাহত থাকে, তবে বিশ্বকাপের দর্শক উপস্থিতি ও বৈশ্বিক উৎসবের আবহে প্রভাব পড়তে পারে। যদিও আয়োজক দেশ ও ফিফা কর্তৃপক্ষ এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে আসছে, তবুও সাবেক ফুটবল নেতাদের প্রকাশ্য বর্জন আহ্বান বিশ্বকাপের আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপ আয়োজনকে ঘিরে নিরাপত্তা, ভিসা নীতি ও রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রশ্ন সামনে এসেছে। একদিকে সাবেক নেতৃত্বের বর্জনের আহ্বান, অন্যদিকে বর্তমান ফিফা সভাপতির ঐক্যের বার্তা—এই দ্বৈত অবস্থান বিশ্বকাপের প্রাক্কালে আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গনে একটি জটিল বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটাচ্ছে।

খেলাধূলা শীর্ষ সংবাদ