অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে কিংবা আগামী সপ্তাহের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ওপর আরোপিত পাল্টা শুল্ক (রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ) কমানোর বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিতে পারে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়সংক্রান্ত বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী। তাঁর মতে, ওয়াশিংটন এ বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখাচ্ছে এবং সাম্প্রতিক আলোচনাগুলো শুল্ক হ্রাসের সম্ভাবনাকে আরও জোরালো করেছে।
মঙ্গলবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান লুৎফে সিদ্দিকী। সুইজারল্যান্ডের দাভোসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে (ডব্লিউইএফ) বাংলাদেশের অংশগ্রহণ, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা এবং প্রাপ্ত অগ্রগতির বিষয়ে জানাতেই এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লুৎফে সিদ্দিকী বলেন, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পণ্যের ওপর যে ২০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছে, তা কমানোর বিষয়ে তারা আন্তরিক। তবে শুল্ক কত শতাংশ কমানো হবে বা কোন পণ্যে কী ধরনের পরিবর্তন আসবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। তিনি জানান, শিগগিরই এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি স্পষ্ট ঘোষণা আসতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ফাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের সঙ্গে শুল্ক ও বাণিজ্যসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলেও জানান তিনি। লুৎফে সিদ্দিকীর ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের অশুল্কনীতি এবং বাণিজ্যসংক্রান্ত বেশ কিছু অবস্থান বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের চলমান সংস্কার কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিশেষ করে বাণিজ্য সহজীকরণ, শুল্ক কাঠামো সংস্কার এবং নীতিগত স্বচ্ছতার বিষয়ে বাংলাদেশের উদ্যোগগুলো যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এ ছাড়া তিনি উল্লেখ করেন, একসময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রায় ৬০০ কোটি মার্কিন ডলারের বাণিজ্যঘাটতি ছিল, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। এই পরিবর্তন যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। এসব বিষয় মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ওপর থেকে কিছু বাণিজ্য বাধা কমানোর বিষয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে বলে জানান তিনি। তাঁর মতে, যদি শুল্ক কমানো হয়, তাহলে তা বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের জন্য স্বস্তির বার্তা বয়ে আনবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হবে।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাণিজ্য সম্পর্ক নিয়েও বিস্তারিত কথা বলেন লুৎফে সিদ্দিকী। তিনি জানান, দাভোসে ইইউ কমিশনার রোক্সানা মিনজাতু এবং জোজেফ সিকেলার সঙ্গে সম্ভাব্য মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আলোচনায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ইইউর সঙ্গে এফটিএ স্বাক্ষরের আগ্রহ স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
লুৎফে সিদ্দিকীর মতে, ইইউ প্রতিনিধিরাও এ বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, তবে তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও আলোচনার প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে ধীরগতির। তিনি বলেন, ইইউ বর্তমানে ভারতের সঙ্গে একটি মুক্তবাণিজ্য চুক্তি নিয়ে কাজ করছে। এই প্রক্রিয়া শেষ হলে তারা ভিয়েতনামের দিকেও অগ্রসর হতে পারে, যা বাংলাদেশের জন্য প্রতিযোগিতামূলক দিক থেকে কিছুটা চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
তবে এ পরিস্থিতিকে নেতিবাচকভাবে দেখার কারণ নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইইউর সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনা এবং কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখা জরুরি। এতে করে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য একটি অনুকূল বাণিজ্য কাঠামো তৈরি করা সম্ভব হবে। তিনি আরও বলেন, মুক্তবাণিজ্য চুক্তি সংক্রান্ত আলোচনা দীর্ঘমেয়াদি একটি প্রক্রিয়া এবং এর সুফল পেতে হলে ধারাবাহিক প্রস্তুতি ও নীতিগত সমন্বয় প্রয়োজন।
লুৎফে সিদ্দিকী জানান, এফটিএ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আলোচনার বিষয়ে তিনি পরবর্তী সরকারের জন্য বিস্তারিত নোট ও পর্যবেক্ষণ রেখে যাবেন, যাতে ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারকেরা আলোচনাগুলো এগিয়ে নিতে সুবিধা পান। তাঁর মতে, বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন ও শুল্ক সুবিধা অর্জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।


