জাতীয় ডেস্ক
সরকারি প্রতিষ্ঠানে পাঁচ বছরের বেশি সময় একই দায়িত্বে কর্মকর্তাদের কাজ করা সমীচীন নয় বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তাঁর মতে, দীর্ঘ সময় একই জায়গায় থাকার ফলে কর্মকর্তাদের মানসিক কাঠামো স্থবির হয়ে পড়ে এবং সৃজনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনি বলেন, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট সময় পরপর নতুন করে সংগঠিত করা প্রয়োজন, যাতে সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত লক্ষ্য ও বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় থাকে।
বুধবার (২৮ জানুয়ারি) দুপুরে রাজধানীর বাংলাদেশ–চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ‘ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপো–২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বর্তমান অবস্থা, সম্ভাবনা ও কাঠামোগত সংস্কার নিয়ে তিনি সেখানে বিস্তারিত বক্তব্য দেন।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, সরকারি ও বেসরকারি—সব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের ব্যবস্থাপনা ও চিন্তাধারায় কাজ করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য ও চ্যালেঞ্জ বদলালেও কর্মীদের মধ্যে পুরোনো ধ্যানধারণা থেকে যায়, যা উদ্ভাবন ও কার্যকারিতাকে সীমিত করে। এই বাস্তবতায় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও নতুন নেতৃত্ব গড়ে তোলার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
চাকরি ও কর্মসংস্থানের প্রচলিত ধারণা প্রসঙ্গে ড. ইউনূস বলেন, সবার জন্য আজীবন চাকরি নিশ্চিত করার ধারণাটি বাস্তবসম্মত নয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রের দায়িত্ব হওয়া উচিত উদ্যোক্তা তৈরিতে সহায়তা করা, যাতে মানুষ নিজস্ব উদ্যোগে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে। তিনি উদ্যোক্তা সংস্কৃতি বিকাশে নীতিগত সহায়তা, প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামো জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন।
ডিজিটাল রূপান্তর প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বর্তমান বিশ্বে তথ্যপ্রযুক্তি একটি কেন্দ্রীয় খাতে পরিণত হয়েছে। এই খাতের উন্নয়ন অন্যান্য সব খাতের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব ফেলে। তাঁর মতে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশাসন, শিল্প ও ব্যবসা—সব ক্ষেত্রেই ডিজিটাল প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার পরিবর্তনের গতি ত্বরান্বিত করতে পারে।
নাগরিক সেবার ডিজিটালাইজেশন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নীতিগতভাবে বিভিন্ন সেবাকে ডিজিটাল করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও অনেক ক্ষেত্রে তা কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। প্রযুক্তির প্রকৃত শক্তি তখনই কাজে লাগবে, যখন সরকার একটি কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি করে জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে দেবে এবং নাগরিকরা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী সেটি ব্যবহার করতে পারবে। এতে সেবার স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়বে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষা অবকাঠামো নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে ড. ইউনূস জানান, পাহাড়ি তিন জেলায় অবস্থিত প্রায় আড়াই হাজার স্কুলের মধ্যে অল্পসংখ্যক স্কুলে ইন্টারনেট সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে। যেখানে শিক্ষক সংকট রয়েছে, সেখানে ইন্টারনেটভিত্তিক শিক্ষাসামগ্রী শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন। ডিজিটাল শিক্ষার বিস্তার এই ধরনের অঞ্চলে শিক্ষার বৈষম্য কমাতে সহায়ক হতে পারে বলেও তিনি মত দেন।
প্রযুক্তি খাতে জালিয়াতি ও অনিয়মের প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। প্রযুক্তিতে সক্ষমতা অর্জন করতে হলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি বলেন, দেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা রয়েছে এবং সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এ খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
তিন দিনব্যাপী এই প্রযুক্তি প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ, বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (বিএইচটিপিএ) এবং বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি (বিসিএস)। প্রদর্শনী চলবে আগামী ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের শুরুতে ‘ক্রিয়েট হিয়ার, কানেক্ট এভরিহোয়ার’ শীর্ষক একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়, যেখানে ভবিষ্যৎ ডিজিটাল উদ্ভাবনের ধারণা তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব। আইসিটি বিভাগের সচিব শীষ হায়দার চৌধুরীর সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা এবং বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম। উদ্বোধনী পর্ব শেষে প্রধান উপদেষ্টা প্রদর্শনীর বিভিন্ন স্টল পরিদর্শন করেন।


