আইন আদালত ডেস্ক
রাজধানীর কল্যাণপুরের ‘জাহাজ বাড়ি’তে ২০১৬ সালে সংঘটিত আলোচিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আটজনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন এই অভিযোগপত্র জমা দেয়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম সাংবাদিকদের জানান, ২০১৬ সালের ২৫ জুলাই কল্যাণপুরের একটি বহুতল ভবনে সংঘটিত অভিযানের ঘটনায় নয়জনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগে এ মামলা করা হয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া, পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) সাবেক প্রধান মনিরুল ইসলামসহ মোট আটজন। অভিযোগপত্রে তাঁদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, কল্যাণপুরের ‘জাহাজ বাড়ি’ নামে পরিচিত ভবনটিতে ওই দিন একটি কথিত জঙ্গি নিধন অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানের সময় সেখানে নয়জন তরুণ নিহত হন। পরবর্তীতে এ ঘটনায় নিহতদের পরিবার এবং মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট পক্ষ থেকে অভিযোগ ওঠে, এটি কোনো সশস্ত্র সংঘর্ষ ছিল না; বরং পরিকল্পিতভাবে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে মামলাটি দায়ের করা হয়।
মামলার নথি ও প্রসিকিউশনের বক্তব্য অনুযায়ী, তদন্তে উঠে এসেছে যে নিহত নয়জনকে ঘটনার অনেক আগেই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আটক করা হয়েছিল। তাঁদের কেউ কেউ দুই থেকে তিন মাস পর্যন্ত গোয়েন্দা হেফাজতে ছিলেন বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়। পরে তাঁদের কল্যাণপুরের ওই ভবনে একত্র করা হয়। ঘটনার রাতে ‘ব্লক রেইড’ পরিচালনার কথা জানিয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সেখানে উপস্থিত হন। এরপর গুলিবর্ষণের মাধ্যমে নয়জনকে হত্যা করা হয় এবং ঘটনাটিকে জঙ্গি বিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে প্রচার করা হয় বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা দীর্ঘ সময় ধরে এই ঘটনার তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করে। সাক্ষ্য, নথি ও অন্যান্য উপাদান বিশ্লেষণ করে তদন্ত সংস্থা মনে করে, এটি একটি পরিকল্পিত ও সংগঠিত হত্যাকাণ্ড, যা আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের আওতায় মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচ্য। সেই আলোকে প্রসিকিউশন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু করার আবেদন জানায়।
এর আগে, গত বছরের ২৪ মার্চ এই মামলার প্রাথমিক শুনানি শেষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক, ডিএমপির সাবেক কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া এবং ডিএমপি মিরপুর বিভাগের সাবেক উপ-কমিশনার (ডিসি) মো. জসীম উদ্দীন মোল্লাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। ওই আদেশের মাধ্যমে মামলাটি বিচারিক পর্যায়ে অগ্রসর হয়।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কল্যাণপুরের এই ঘটনা দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত নিরাপত্তা অভিযানগুলোর একটি। এ ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে শীর্ষ পর্যায়ের সাবেক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল হওয়ায় মামলাটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ গঠনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্কের মাধ্যমে বিচার কার্যক্রম এগিয়ে যাবে।
প্রসিকিউশন পক্ষ জানিয়েছে, অভিযোগ প্রমাণে তারা পর্যাপ্ত নথিপত্র, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সাক্ষ্য এবং তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করবে। অপরদিকে অভিযুক্ত পক্ষের আইনজীবীরা অভিযোগ অস্বীকার করে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাবেন। ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম আইন অনুযায়ী প্রকাশ্য শুনানির মাধ্যমে পরিচালিত হবে বলে জানা গেছে।


