মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ অধ্যাদেশে ইউরোপীয় চার দেশের সমর্থন

মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ অধ্যাদেশে ইউরোপীয় চার দেশের সমর্থন

বাংলাদেশ ডেস্ক

মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান রোধে বাংলাদেশ সরকারের প্রণীত ‘মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর প্রতি সমর্থন জানিয়েছে ইতালি, জার্মানি, যুক্তরাজ্য ও নেদারল্যান্ডসের দূতাবাস। বুধবার প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে সংশ্লিষ্ট চার দেশের রাষ্ট্রদূত ও কূটনৈতিক প্রতিনিধিরা অধ্যাদেশটির লক্ষ্য ও বিধান সম্পর্কে ইতিবাচক অবস্থান জানান। বৃহস্পতিবার সকালে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে এ তথ্য জানানো হয়।

বৈঠকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই), স্পেশাল ব্রাঞ্চ, অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বৈঠকের আলোচ্যসূচিতে মানব পাচার, ভুয়া ভিসা আবেদন, অভিবাসী চোরাচালান, নথি জালিয়াতি এবং এসব অপরাধ দমনে সমন্বিত উদ্যোগের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।

আলোচনায় জানানো হয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভুয়া ভিসা আবেদন ও নথি জালিয়াতির ঘটনা বাড়ায় বাংলাদেশ থেকে ইউরোপমুখী অভিবাসন প্রক্রিয়ায় আস্থার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার ভুয়া নথি ব্যবহার, অবৈধ অভিবাসন সহায়তা এবং সংশ্লিষ্ট দালালচক্রকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে অধ্যাদেশটি প্রণয়ন করে। এতে মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালানে জড়িত ব্যক্তি ও চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

বৈঠকে অংশগ্রহণকারী কূটনৈতিক প্রতিনিধিরা উল্লেখ করেন, অতীতে বাংলাদেশে ভুয়া নথি ব্যবহারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে পর্যাপ্ত দৃশ্যমান উদ্যোগ না থাকায় একটি নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছিল। এর ফলে কিছু দেশে ভিসা যাচাই প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয় এবং আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা আরোপ করা হয়। আলোচনায় জানানো হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে দেশে ও বিদেশে অবস্থানরত অসাধু চক্র ভুয়া চাকরির প্রস্তাব, পর্যটন ভিসা ও আর্থিক বিবরণীর মাধ্যমে প্রতারণা চালিয়েছে, যদিও সে সময় মামলার সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম ছিল।

বৈঠকে কয়েকটি ঘটনার উদাহরণ তুলে ধরা হয়। একটি দূতাবাস জানায়, তাদের কাছে প্রাপ্ত ৬০০টির বেশি ভিসা আবেদনের সঙ্গে ভুয়া চাকরির প্রস্তাবপত্র সংযুক্ত ছিল। আরেকটি দূতাবাস একই এলাকা থেকে ৩০০টি পর্যটন ভিসার আবেদন পায়, যেখানে একই ব্যাংকের জাল আর্থিক বিবরণী ব্যবহার করা হয়। আরও একটি ঘটনায় একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজ ব্যবহার করে প্রায় ৭০ জনের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের পর পেজটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।

এসব পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মানব পাচার ও নথি জালিয়াতি সংক্রান্ত মামলার তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রম জোরদার করেছে বলে বৈঠকে জানানো হয়। ইমিগ্রেশন পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর গড়ে প্রতিদিন ৪০ জনের বেশি যাত্রীকে বিমানবন্দর থেকে ভ্রমণসংক্রান্ত অনিয়মের কারণে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

আলোচনায় ভিসা-অন-অ্যারাইভাল সুবিধাসম্পন্ন কিছু বিমানবন্দরকে তৃতীয় দেশে অবৈধ যাত্রার ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টিও উঠে আসে। একটি ইউরোপীয় দেশ জানায়, গত বছর তারা বাংলাদেশি নাগরিকদের কাছ থেকে ছয় হাজারের বেশি আশ্রয় আবেদন পেয়েছে, যাঁদের একটি বড় অংশ শিক্ষার্থী বা কর্মভিসায় সে দেশে প্রবেশ করেছিলেন।

আস্থার সংকটের কারণে কিছু দেশে বাংলাদেশি নথিপত্র যাচাইয়ে বাড়তি সময় লাগছে বলে উদ্বেগ জানানো হয়। বৈঠকে উল্লেখ করা হয়, একটি দেশ চলমান তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সাময়িকভাবে বাংলাদেশিদের ভিসা আবেদন গ্রহণ স্থগিত রেখেছে।

ইতিবাচক দিক হিসেবে ব্যাংক বিবরণী যাচাই সহজ করতে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) কিউআর কোডভিত্তিক যাচাই ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগের প্রশংসা করা হয় এবং এটি পুরো ব্যাংক খাতে সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অপরাধ দমনে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রিটার্নি কেস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিগত সহায়তার ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়।

বিএমইটি জানায়, তাদের অধিকাংশ সেবা এখন স্বয়ংক্রিয় এবং ইমিগ্রেশন পুলিশের সঙ্গে সংযুক্ত। এর ফলে প্রথমবারের মতো বিএমইটি কার্ডধারী কর্মীদের বিদেশ যাওয়া ও ফেরার তথ্য নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে। আলোচনায় নিবন্ধিত রিক্রুটিং এজেন্টদের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ের সাব-এজেন্টদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকার বিষয়টি চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং এ বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়।

বৈঠকে হেগ অ্যাপোস্টিল কনভেনশনে বাংলাদেশের যোগদান এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ইস্যু করা অ্যাপোস্টিল নথির বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। বৈঠকের শেষে অংশগ্রহণকারীরা মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধে স্বচ্ছতা ও আইনের কঠোর প্রয়োগে অন্তর্বর্তী সরকারের অবস্থানকে স্বাগত জানান।

জাতীয় শীর্ষ সংবাদ