রাজনীতি ডেস্ক
চীন–বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা ও অংশীদারত্ব আরও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে চীন–বাংলাদেশ অংশীদারত্ব ফোরামের একটি প্রতিনিধিদল বৈঠক করেছে। গত বুধবার রাজধানীর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। শুক্রবার সকালে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করে।
বৈঠকে অংশ নেওয়া প্রতিনিধিদলে চীনের বিভিন্ন খাতের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, বিনিয়োগকারী, বায়োমেডিক্যাল বিজ্ঞানী, অবকাঠামো ও ডিজিটাল প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, আইন খাতের প্রতিনিধি এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অবকাঠামো ও ডিজিটাল খাতে সম্ভাব্য সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়।
প্রতিনিধিদলের সদস্য সিচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েস্ট চায়না স্কুল অব মেডিসিনের পরিচালক এবং খ্যাতনামা বায়োমেডিক্যাল বিজ্ঞানী সিন-ইউয়ান ফু অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাধারার প্রশংসা করেন। তিনি বাংলাদেশের শিক্ষাবিদদের সঙ্গে যৌথভাবে গবেষণা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
প্রেস উইং জানায়, বৈঠকে ‘ওয়ালভ্যাক্স বায়োটেকনোলজি’র পরিচালনা পর্ষদের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা অ্যান্ড্রু জিলং ওং এবং ‘ওয়ালভ্যাক্স বায়োটেক (সিঙ্গাপুর)’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইউচিং ইয়াও বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তারা জানান, প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে অন্তত ২২টি দেশে টিকা রপ্তানি করছে এবং বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে পিসিভি ও এইচপিভি টিকা উৎপাদনের সম্ভাবনা পর্যালোচনা করছে। প্রতিষ্ঠানটির যুক্তরাজ্য ও ইন্দোনেশিয়াতেও স্থানীয় সহযোগী সংস্থা রয়েছে।
চীনা প্রতিনিধিদলে আরও উপস্থিত ছিলেন সিঙ্গাপুর রোবটিকস সোসাইটির সহসভাপতি জিনসং ওয়াং, ফোর্ডাল ল ফার্মের ব্যবস্থাপনা কমিটির চেয়ারম্যান ইউয়ান ফেং, বেইজিং উতং অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক লি রান, চায়না স্টেট কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও প্রকল্পবিষয়ক সহসভাপতি গাও ঝিপেং, চায়না হুনান কনস্ট্রাকশন ইনভেস্টমেন্ট গ্রুপের বিনিয়োগ পরিচালক শু তিয়ানঝাও, চায়না সিসিসি ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপের সহসভাপতি হুয়া জিয়ে, পাওয়ার চায়না ওভারসিজ ইনভেস্টমেন্ট গ্রুপের বৈদেশিক বাজারবিষয়ক মহাব্যবস্থাপক চেন শুজিয়ান, ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মা শিয়াওইউয়ান এবং চীন–বাংলাদেশ অংশীদারত্ব ফোরামের মহাসচিব অ্যালেক্স ওয়াং জেকাই।
বৈঠকে চীনা প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের তরুণ শিক্ষার্থীদের মেধা, দক্ষতা ও সম্ভাবনার প্রশংসা করেন। তারা জানান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটালাইজেশন বিষয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষার্থীর সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন এবং ভবিষ্যতে এই খাতে যৌথ উদ্যোগের সুযোগ রয়েছে।
আলোচনার একপর্যায়ে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস মাইক্রোক্রেডিট আন্দোলনের সূত্র ধরে চীনের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, চীনের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে তিনি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমানের পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করেছেন, যা পরবর্তীতে দেশটির নিজস্ব কর্মসূচি গ্রহণে ভূমিকা রেখেছে।
গত বছরের মার্চে চীন সফরের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা জানান, ওই সফরে তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিন পিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট শি চিন পিং তাঁর লেখা বই পাঠ করেছেন এবং সেখানকার নীতিগুলো অনুসরণ করেছেন বলে তাকে অবহিত করেছেন।
বৈঠকে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, শিগগির নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করলেও বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার সহযোগিতা অব্যাহত থাকা প্রয়োজন। তিনি জানান, কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তিনি দায়িত্ব ছাড়লেও চলমান ও ভবিষ্যৎ যৌথ কার্যক্রম অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
স্বাস্থ্য খাতকে অন্তর্বর্তী সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে চিকিৎসক ও রোগীর সংযোগ, চিকিৎসা ইতিহাসের ডিজিটাল সংরক্ষণ এবং সহজে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়ার ব্যবস্থা গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য। একই সঙ্গে তিনি ওষুধ খাতে সামাজিক ব্যবসাভিত্তিক উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
অধ্যাপক ইউনূস বলেন, কম খরচে উৎপাদিত ওষুধ উচ্চমূল্যে বিক্রির যে প্রবণতা রয়েছে, তা পরিবর্তনের লক্ষ্যে মানুষের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দিয়ে সামাজিক ব্যবসাভিত্তিক ফার্মাসিউটিক্যাল প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। কভিড-১৯ মহামারির সময় পেটেন্টমুক্ত টিকার পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থানের কথাও তিনি স্মরণ করেন।
এ সময় উত্তরাঞ্চলে একটি ‘হেলথ সিটি’ গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সেখানে এক হাজার শয্যার আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল, মেডিক্যাল কলেজ, গবেষণা কেন্দ্র, টিকা উৎপাদন ও ওষুধশিল্পসহ স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান একত্রে গড়ে তোলা হবে। এতে বাংলাদেশ ছাড়াও প্রতিবেশী ভারত, নেপাল ও ভুটানের জনগণ উপকৃত হওয়ার সুযোগ পাবেন।
বৈঠক শেষে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ধারাবাহিক সহযোগিতা ও সমর্থনের জন্য চীনা সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।


