রাজনীতি ডেস্ক
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, বাংলাদেশের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে চাওয়া পরাশক্তিগুলোর মোকাবিলায় দেশের নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধি ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই। অর্থনীতি, রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও সামগ্রিক জাতীয় শক্তিকে সুসংহত করাই দেশের মর্যাদা ও স্বার্থ রক্ষার প্রধান ভিত্তি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
শুক্রবার রাজধানীর গুলশানে একটি হোটেলে আয়োজিত ‘তারুণ্য ও মর্যাদার ইশতেহার’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে দলের ৩৬ দফা নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা উপলক্ষে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াসহ কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, আধিপত্যবাদবিরোধী অবস্থান কেবল স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকলে তা কার্যকর হয় না। এ জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রের ভেতরকার শক্তি ও সক্ষমতা বৃদ্ধি। তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী করা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর করা এবং সামগ্রিক উন্নয়নের মাধ্যমে জাতীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করাই এনসিপির মূল লক্ষ্য।
দলের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, এনসিপির নেতৃত্ব ও আদর্শ গড়ে উঠেছে গণঅভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময়ে দেশে এমন এক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, যার ফলে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়নি। এই বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে এমন একটি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রয়োজন, যা স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের পুনরাবৃত্তি রোধ করবে এবং সমাজের সব শ্রেণির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে।
নির্বাচনী জোট প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের বিষয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন উঠলেও এনসিপি তার মৌলিক অবস্থান থেকে সরে আসেনি। তাঁর মতে, ১১ দলীয় এই জোট মূলত একটি নির্বাচনী ঐক্য, যেখানে কিছু ন্যূনতম রাজনৈতিক ইস্যুতে সমঝোতার ভিত্তিতে একসঙ্গে কাজ করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে সরকারে অংশগ্রহণের সুযোগ পেলে ইশতেহারে ঘোষিত বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হবে বলে তিনি জানান।
ইশতেহারের নামকরণ প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘তারুণ্য ও মর্যাদা’—এই দুটি বিষয়কে সামনে রেখে দল তাদের ভবিষ্যৎ কর্মসূচি নির্ধারণ করেছে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানের পর তরুণদের মধ্যে যে রাজনৈতিক ও সামাজিক জাগরণ দেখা গেছে, সেটিকে রাষ্ট্র গঠনের ইতিবাচক শক্তিতে রূপান্তর করাই এনসিপির অন্যতম চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা। একই সঙ্গে বিগত সময়ে নাগরিক অধিকার ও মানবিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার যে অভিযোগ উঠেছে, তা নিরসনে দলটি অঙ্গীকারবদ্ধ বলে তিনি জানান।
ইশতেহারের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকারগুলোর মধ্যে রয়েছে একটি স্বাধীন কমিশনের মাধ্যমে ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন এবং গত ১৬ বছরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার বিচার নিশ্চিত করা। নাহিদ ইসলাম বলেন, বিচার প্রক্রিয়া হবে স্বচ্ছ এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন। এ ছাড়া সত্য উদ্ঘাটন ও সামাজিক সংহতি গড়ে তুলতে একটি ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ গঠনের পরিকল্পনার কথাও তিনি জানান।
জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে ইশতেহারে সশস্ত্র বাহিনীর জন্য একটি বৃহত্তর রিজার্ভ ফোর্স গঠনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। পাশাপাশি সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়নের লক্ষ্যে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সেনাবাহিনীতে মনুষ্যবিহীন আকাশযান (ইউএভি) ব্রিগেড গঠন এবং আকাশ প্রতিরক্ষা জোরদারে মাঝারি পাল্লার সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল ব্যাটারি অধিগ্রহণের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়।
পররাষ্ট্রনীতি প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, সীমান্ত হত্যা বন্ধ এবং তিস্তা নদীসহ আন্তর্জাতিক নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে কূটনৈতিকভাবে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হবে। দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় সমাধান না হলে আন্তর্জাতিক আদালতের আশ্রয় নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় থাকবে বলে তিনি জানান।
ইশতেহারে সুশাসন ও অর্থনৈতিক স্বচ্ছতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে ‘হিসাব দাও নামে’ নামে একটি কর্মসূচির প্রস্তাব করা হয়েছে, যেখানে মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের বার্ষিক আয় ও বাজেটের তথ্য প্রকাশের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টায় ১০০ টাকা নির্ধারণ এবং মুদ্রাস্ফীতি ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ঘোষণাও করা হয়।
অনুষ্ঠানে দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, স্বাধীনতার দীর্ঘ সময় পার হলেও গণতন্ত্র ও মানবিক মর্যাদাভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনে দেশ এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। তাঁর মতে, এই বাস্তবতা স্বীকার করাই রাষ্ট্র সংস্কারের প্রথম ধাপ। তিনি জানান, এনসিপি ও তাদের জোট ক্ষমতায় গেলে আইন, নীতি ও প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে ঘোষিত অঙ্গীকার বাস্তবায়নে কাজ করবে।
এনসিপি বর্তমানে ১১ দলীয় জোটের অংশ হিসেবে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০টি আসনে ‘শাপলা ফুল’ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।


