অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
বিনিয়োগ ও বাণিজ্য প্রক্রিয়া সহজীকরণে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের মধ্যে সমন্বয় জোরদার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি বাড়ানোর ফলে বাস্তব অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে বলে জানিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বিনিয়োগ বাস্তবায়নের প্রতিবন্ধকতা কমানো সম্ভব হচ্ছে বলে মনে করছে সরকার।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানায়, এসব অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরা হয় বিনিয়োগ সমন্বয় কমিটির সপ্তম বৈঠকে। বৃহস্পতিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বিনিয়োগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিদ্যমান জটিলতা, সেবা ডিজিটালকরণ, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সংস্কার এবং সিদ্ধান্ত দ্রুত কার্যকর করার অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করা হয়।
বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ দূত ও বিনিয়োগ সমন্বয় কমিটির চেয়ারম্যান লুৎফে সিদ্দিকী। তিনি বলেন, প্রক্রিয়াগত সংস্কার ও প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি দেশের সামগ্রিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাঁর মতে, শুল্কহার বা বৈদেশিক বাজারে প্রবেশাধিকারসহ অনেক বিষয় দেশের নিয়ন্ত্রণে না থাকলেও নীতিমালা, সেবা প্রদান ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা সরকারের হাতেই রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে উন্নয়ন হলে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও মানুষের জীবিকায় দ্রুত ও দৃশ্যমান প্রভাব পড়তে পারে।
বৈঠকে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব কর্তৃপক্ষের (পিপিপি) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামানসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সচিব এবং প্রধান কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
আলোচনায় বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সহজ করতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে আগাম কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স ব্যবস্থার সক্ষমতা বর্তমানের তুলনায় দশ গুণ বাড়ানো, অনলাইনে সমন্বিত ব্যবসা শুরুর প্যাকেজ চালু, চট্টগ্রাম বন্দরে ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল পেমেন্ট সুবিধা নিশ্চিত করা এবং সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় বন্ড ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা কার্যকর করা। কর্মকর্তারা বলেন, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে আমদানি-রপ্তানি ও উৎপাদন কার্যক্রমে সময় ও ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
বৈঠকে অনুমোদিত বিনিয়োগ প্রস্তাবগুলো যেন বাস্তবে রূপ নেয়, সে লক্ষ্যে একাধিক সংস্থার সমন্বয়ে কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়ে একমত হন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। বর্তমানে বিডা, বেজা, বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেপজা) এবং হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে বিনিয়োগ পাইপলাইন পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানানো হয়।
সাম্প্রতিক কয়েকটি সমন্বিত উদ্যোগের অগ্রগতিও বৈঠকে তুলে ধরা হয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অধীনে চালু হওয়া ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো (এনএসডব্লিউ) চালুর ফলে কয়েক মাসের মধ্যেই সরকারি দপ্তরে প্রায় ১২ লাখ সরাসরি যাতায়াতের প্রয়োজন কমেছে বলে জানানো হয়। দীর্ঘদিনের আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয় জটিলতা কাটিয়ে এ ব্যবস্থাটি চালু করা সম্ভব হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরে চালু হওয়া স্বয়ংক্রিয় ট্রাক প্রবেশ ব্যবস্থার ফলে বন্দরে প্রবেশের সময় অন্তত ৯০ শতাংশ কমেছে। একই সঙ্গে ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও নগদবিহীন লেনদেন ব্যবস্থার কারণে স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
তবে বৈঠকে কিছু কাঠামোগত সমস্যার কথাও উঠে আসে। ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু থাকলেও কিছু দপ্তরে এখনো সমান্তরালভাবে অফলাইন প্রক্রিয়া চালু থাকায় কাঙ্ক্ষিত সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাচ্ছে না বলে মত দেন অংশগ্রহণকারীরা। এ প্রসঙ্গে জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোকে (বিএমইটি) একটি ইতিবাচক উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়, যেখানে সম্পূর্ণ ডিজিটাল আবেদন ও পেমেন্ট ব্যবস্থার পাশাপাশি ব্যবহারকারীদের সহায়তায় অন-সাইট হেল্পডেস্ক চালু রয়েছে।
বৈঠকে জানানো হয়, শিগগিরই বিডার উদ্যোগে বাংলাদেশ বিজনেস পোর্টালের প্রথম সংস্করণ চালু করা হবে, যা বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সিটি করপোরেশনের সমন্বয়ে তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসে স্বয়ংক্রিয় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা পরীক্ষামূলকভাবে চালুর প্রস্তুতি চলছে, যার মাধ্যমে পণ্যের শারীরিক পরীক্ষা কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
আগাম কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স প্রসঙ্গে লুৎফে সিদ্দিকী বলেন, নিয়ম থাকলেও বাস্তবায়নে শৃঙ্খলার ঘাটতি রয়েছে। বর্তমানে পাঁচ শতাংশেরও কম পণ্য আগাম ছাড় পাচ্ছে, যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা সমন্বয় কমিটির তথ্যভিত্তিক ও ফলাফলমুখী কার্যপদ্ধতির অগ্রগতি তুলে ধরে ভবিষ্যতে এ ধরনের সংস্কার কার্যক্রম আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেন।


