ইরানে বিক্ষোভ দমনে ভূমিকার অভিযোগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ একাধিক কর্মকর্তার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা

ইরানে বিক্ষোভ দমনে ভূমিকার অভিযোগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ একাধিক কর্মকর্তার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্র শুক্রবার সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে প্রাণঘাতী ভূমিকার অভিযোগে দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ একাধিক ইরানি কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দিয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের দাবি, এসব কর্মকর্তা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সহিংস দমন-পীড়নের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর তত্ত্বাবধান করেছেন।

মার্কিন ট্রেজারি দপ্তরের এক বিবৃতিতে বলা হয়, নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এস্কান্দার মোমেনি। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী (ল’ এনফোর্সমেন্ট ফোর্স—এলইএফ)-এর ওপর তত্ত্বাবধানমূলক দায়িত্ব পালন করেন। এই বাহিনী সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী আন্দোলনে হাজার হাজার শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীর মৃত্যুর জন্য দায়ী একটি প্রধান সংস্থা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ হলো—তারা বিক্ষোভ দমনে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ, নির্বিচারে গ্রেপ্তার, বলপ্রয়োগের মাধ্যমে জনসমাবেশ ছত্রভঙ্গ এবং নাগরিক অধিকার হরণে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। মার্কিন ট্রেজারি দপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের পরিপন্থী এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ দমনের একটি সংগঠিত কাঠামোর অংশ।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরানের বিভিন্ন শহরে অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক স্বাধীনতা, নারীর অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় নীতির বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, এসব বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে বহু মানুষ নিহত ও আহত হন। অনেক ক্ষেত্রে ইন্টারনেট ও যোগাযোগ ব্যবস্থা সীমিত করা হয়, যাতে তথ্য আদান-প্রদান ও সংগঠিত প্রতিবাদ ব্যাহত হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জানানো হয়, নিষেধাজ্ঞার ফলে তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের যুক্তরাষ্ট্রে থাকা সম্পদ জব্দ করা হবে এবং মার্কিন নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাদের যেকোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন নিষিদ্ধ থাকবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় তাদের চলাচল সীমিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনা যায়।

মার্কিন প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলেছেন, এই নিষেধাজ্ঞা কোনো দেশের জনগণের বিরুদ্ধে নয়; বরং যেসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান শান্তিপূর্ণ নাগরিকদের ওপর সহিংসতা চালিয়েছে বা তা অনুমোদন দিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে লক্ষ্যভিত্তিক ব্যবস্থা। যুক্তরাষ্ট্রের মতে, ইরানের জনগণের শান্তিপূর্ণভাবে মতপ্রকাশের অধিকার রয়েছে এবং তা রক্ষায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব আছে।

ইরানের পক্ষ থেকে অতীতে এ ধরনের অভিযোগ ও নিষেধাজ্ঞাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। তেহরানের অবস্থান হলো, দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করেছে এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয়। তবে সাম্প্রতিক এই নিষেধাজ্ঞা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের টানাপোড়েন আরও বাড়াতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে ইরানের ওপর চাপ দীর্ঘদিনের। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশ ও জোট অতীতে ইরানি কর্মকর্তা ও সংস্থার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। বর্তমান পদক্ষেপ সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে বিক্ষোভ দমন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ব্যক্তিভিত্তিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই নিষেধাজ্ঞা তাৎক্ষণিকভাবে ইরানের অভ্যন্তরীণ নীতিতে বড় পরিবর্তন না আনলেও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপ বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে এটি ইরানের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বৈশ্বিক উদ্বেগের প্রতিফলন হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ