জাতিসংঘের আর্থিক সংকট: সদস্য রাষ্ট্রগুলোর বকেয়া চাঁদা কার্যক্রমে হুমকি

জাতিসংঘের আর্থিক সংকট: সদস্য রাষ্ট্রগুলোর বকেয়া চাঁদা কার্যক্রমে হুমকি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করেছেন যে, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর বকেয়া বার্ষিক চাঁদা এবং বিদ্যমান অর্থনৈতিক কাঠামোর কারণে সংস্থাটি মারাত্মক আর্থিক সংকটে পড়েছে। এ সপ্তাহের শুরুতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে প্রেরিত এক চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেছেন, সময়মতো এবং পূর্ণাঙ্গভাবে চাঁদা না দেওয়ার ক্ষেত্রে সংস্থার কার্যক্রম চালু রাখা কঠিন হয়ে যাবে।

চিঠিতে গুতেরেস সদস্য দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, আর্থিক নিয়মাবলী সংস্কারে সম্মত হওয়া বা নির্ধারিত সময়ে চাঁদা পরিশোধ করা এখন অত্যন্ত জরুরি। জাতিসংঘের মুখপাত্র ফারহান হক শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, চাঁদা প্রদানের বিষয়টি ‘এখনই নয়তো কখনোই নয়’-এর পর্যায়ে এসেছে।

গুতেরেস কোনো নির্দিষ্ট দেশের নাম উল্লেখ না করলেও, বিশ্লেষকরা মনে করছেন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ববর্তী প্রশাসনের অর্থায়ন হ্রাস এই সংকটকে আরও তীব্র করেছে। ট্রাম্প প্রশাসন জাতিসংঘসহ ৬৬টি সংস্থা থেকে অর্থায়ন কমানোর ঘোষণা দেয় এবং ‘বোর্ড অব পিস’ নামে একটি নতুন উদ্যোগ চালু করে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর বার্ষিক চাঁদা তাদের জিডিপি ও অন্যান্য অর্থনৈতিক সূচকের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। মূল বাজেটের প্রায় ২২ শতাংশ দেয় যুক্তরাষ্ট্র এবং ২০ শতাংশ দেয় চীন। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ বকেয়া চাঁদার পরিমাণ রেকর্ড ১ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।

চলতি মাসের শুরুতে জাতিসংঘ ২০২৬ সালের জন্য ৩ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারের বাজেট অনুমোদন করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৭ শতাংশ কম। তবে গুতেরেস সতর্ক করেছেন যে, বর্তমান চাঁদা প্রাপ্তির গতি অব্যাহত থাকলে জুলাইয়ের মধ্যেই সংস্থার নগদ অর্থ শেষ হয়ে যেতে পারে।

জাতিসংঘের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) পর্যন্ত ১৯৩টি সদস্য দেশের মধ্যে মাত্র ৩৬টি দেশ ২০২৬ সালের নিয়মিত চাঁদা সম্পূর্ণভাবে পরিশোধ করেছে। বাকি দেশগুলো বকেয়া থাকার কারণে সংস্থার বিভিন্ন কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই আর্থিক সংকট শুধু সংস্থার দৈনন্দিন কার্যক্রমকে প্রভাবিত করবে না, বরং শান্তি স্থাপনা, মানবিক সহায়তা ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোর পুনর্বাসন, খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা সহায়তা, এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার উদ্যোগের জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল প্রাপ্তি কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

জাতিসংঘ মহাসচিব ইতিমধ্যেই বিভিন্ন বৈঠক ও আলোচনা শুরু করেছেন যাতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে বকেয়া চাঁদা পরিশোধের বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করা যায়। তিনি উল্লেখ করেছেন, সংস্থার দায়িত্ব পালন এবং আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে অর্থায়নের নিশ্চয়তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর চাঁদা প্রাপ্তির সময়মতো ব্যবস্থা না নেওয়া হলে সংস্থার স্বচ্ছন্দ কার্যক্রমে দীর্ঘমেয়াদি বাধা সৃষ্টি হতে পারে। ফলে এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতার মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে, জাতিসংঘের স্থিতিশীলতা এবং কার্যকর কার্যক্রম নিশ্চিত করতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ এবং আর্থিক দায়বদ্ধতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা জরুরি বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ