আইন আদালত ডেস্ক
জুলাই–আগস্ট আন্দোলনের সময় সাভারের আশুলিয়ায় ছয়জনের মরদেহ পোড়ানোসহ সাতজনকে হত্যার অভিযোগে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় আগামী ৫ ফেব্রুয়ারি ঘোষণা করা হবে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ দিন রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ করেছেন।
রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ সিদ্ধান্ত দেন। প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি শওকত হোসেন ও বিচারপতি আবু সাঈদ মোহাম্মদ। এর আগে গত ২০ জানুয়ারি রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন সম্পন্ন হলে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়।
এই মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলামসহ মোট ১৬ জনকে আসামি করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টে সংঘটিত আন্দোলনের সময় আশুলিয়া এলাকায় ধারাবাহিক সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। রাষ্ট্রপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, ৫ আগস্ট ছয়জন ব্যক্তিকে হত্যা করার পর তাঁদের মরদেহ পুড়িয়ে ফেলা হয়। অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, নিহতদের মধ্যে একজনকে জীবিত অবস্থায় আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। একই সঙ্গে ৪ আগস্ট আশুলিয়া থানার সামনে আরেক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যার অভিযোগও আনা হয়েছে আসামিদের বিরুদ্ধে।
মামলার নথি অনুযায়ী, এসব ঘটনার সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কয়েকজন সদস্যের সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। আসামিদের মধ্যে ঢাকা জেলার সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) আব্দুল্লাহিল কাফী, ঢাকা জেলা পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) শাহিদুল ইসলাম, পরিদর্শক আরাফাত হোসেন, উপপরিদর্শক মালেক, উপপরিদর্শক আরাফাত উদ্দিন, সহকারী উপপরিদর্শক কামরুল হাসান, আবজাল ও কনস্টেবল মুকুল বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা গেছে, সাবেক এমপি সাইফুল ইসলামসহ আরও আটজন আসামি পলাতক রয়েছেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ গত বছরের ২১ আগস্ট এই মামলায় ১৬ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করেন। অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে মামলার বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর সাক্ষ্যগ্রহণ, জেরা ও উভয় পক্ষের লিখিত ও মৌখিক যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিরা আদালতে যুক্তিতর্কে বলেন, ঘটনার সময় আশুলিয়া এলাকায় আন্দোলনরত সাধারণ মানুষের ওপর পরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো হয়। হত্যাকাণ্ডের পর মরদেহ গুম করার উদ্দেশ্যে আগুনে পোড়ানো হয়, যা মানবতাবিরোধী অপরাধের সংজ্ঞার আওতায় পড়ে। তাঁরা এসব অভিযোগ প্রমাণে সাক্ষ্য, নথিপত্র ও অন্যান্য আলামতের ওপর নির্ভর করেন।
অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, মামলাটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ বিশ্বাসযোগ্য নয়। তাঁরা সাক্ষ্য ও প্রমাণের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং আসামিদের খালাস চেয়ে যুক্তি উপস্থাপন করেন।
এই মামলার রায়কে ঘিরে সংশ্লিষ্ট মহল ও আইন অঙ্গনে ব্যাপক আগ্রহ দেখা দিয়েছে। জুলাই–আগস্ট আন্দোলনের সময় সংঘটিত সহিংস ঘটনার বিচার প্রক্রিয়ায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। রায় ঘোষণার মাধ্যমে অভিযুক্তদের দায় নির্ধারণের পাশাপাশি ওই সময়কার সহিংস ঘটনার বিচারিক মূল্যায়নের একটি দৃষ্টান্ত স্থাপিত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা গেছে, রায় ঘোষণার দিন নিরাপত্তা ও আদালতের কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ৫ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত তারিখে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ আনুষ্ঠানিকভাবে রায় ঘোষণা করবেন।


