ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পুনরায় আলোচনার ইঙ্গিত, ইস্তাম্বুলে বৈঠকের সম্ভাবনা

ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পুনরায় আলোচনার ইঙ্গিত, ইস্তাম্বুলে বৈঠকের সম্ভাবনা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

দীর্ঘদিনের সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরান তার পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পুনরায় আলোচনায় বসার জোরালো ইঙ্গিত দিয়েছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এ সংক্রান্ত আলোচনাকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য আনুষ্ঠানিক নির্দেশ দিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে মধ্যপ্রাচ্য ও আঞ্চলিক কয়েকটি দেশ মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করছে।

কূটনৈতিক সূত্র অনুযায়ী, কাতার, তুরস্ক, মিসর ও ওমানের মধ্যস্থতায় আগামী শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) তুরস্কের ইস্তাম্বুলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রস্তাবিত বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির অংশগ্রহণের কথা বিবেচনায় রয়েছে। যদিও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বৈঠকের সময়সূচি ঘোষণা করা হয়নি, তবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো প্রস্তুতি জোরদার করছে বলে জানা গেছে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে বিদ্যমান উত্তেজনা কমানোর লক্ষ্যে আঞ্চলিক দেশগুলোর প্রস্তাবিত একাধিক কূটনৈতিক কাঠামো গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, আলোচনার একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তৈরির কাজ চলমান রয়েছে এবং আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই এ বিষয়ে অগ্রগতি প্রত্যাশিত। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা অব্যাহত আছে এবং কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ সতর্কতার সঙ্গে চূড়ান্ত করা হচ্ছে।

এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ইতোমধ্যে সৌদি আরব, মিসর ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে টেলিফোনে আলোচনা করেছেন। এসব আলোচনায় আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে উদ্বেগ এবং সম্ভাব্য আলোচনার কাঠামো নিয়ে মতবিনিময় হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইরানের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আঞ্চলিক সহযোগিতা ছাড়া এ ধরনের জটিল ইস্যুতে অগ্রগতি অর্জন কঠিন।

এই কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে এমন এক সময়ে, যখন তেহরান ও ওয়াশিংটন উভয় পক্ষই সরাসরি সামরিক সংঘাতের ভাষা থেকে কিছুটা সরে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে। গত জুন মাসে ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর পরমাণু আলোচনা কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছিল। ওই ঘটনার পর উভয় দেশের মধ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায় এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ইরানকে তার পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে একটি নতুন চুক্তিতে পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি আলোচনার পথ খোলা রাখার বিষয়টিও পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তবে বাস্তব পরিস্থিতিতে আলোচনার পরিবেশ এখনো পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয়। একদিকে কূটনৈতিক যোগাযোগের বার্তা দেওয়া হলেও অন্যদিকে পারস্য উপসাগরের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন সামরিক চাপ অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই আলোচনা নিয়ে ভিন্নমত দেখা যাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান আলোচনার পক্ষে অবস্থান নিলেও দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এখনো সতর্ক ও কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, ইরানের ওপর কোনো ধরনের সামরিক আক্রমণ হলে তা কেবল দ্বিপক্ষীয় সংঘাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং তা পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ব্যাপক আঞ্চলিক সংঘাতের রূপ নিতে পারে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ আজ মঙ্গলবার ইসরায়েল সফরে যাচ্ছেন। সেখানে তাঁর সঙ্গে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বৈঠকের কথা রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই বৈঠকে ইরান ইস্যু, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং সম্ভাব্য আলোচনার কৌশল নিয়ে আলোচনা হবে। ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে আসছে।

সব মিলিয়ে, ইস্তাম্বুলে সম্ভাব্য বৈঠকটি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই আলোচনা সফল হলে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা প্রশমনের পাশাপাশি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা জোরদার হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে ব্যর্থ হলে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে বলে কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ