আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি দেশটিতে চলমান অস্থিরতা ও বিক্ষোভের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে দায়ী করেছেন। তেহরানে পুলিশ ক্যাডেটদের একটি স্নাতক অনুষ্ঠানে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ কোনো স্বতঃস্ফূর্ত গণআন্দোলন নয়; বরং ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের অগ্রগতি ব্যাহত করার উদ্দেশ্যে বিদেশি শক্তির পরিকল্পিত তৎপরতার ফল।
দীর্ঘ সময় প্রকাশ্য মন্তব্য না করার পর এই ভাষণে খামেনি বলেন, ইরানে যে সহিংসতা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে, তা সাধারণ নাগরিকদের দাবি বা প্রতিবাদের প্রকাশ নয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করা হয়েছে এবং এর পেছনে পশ্চিমা শক্তির সুপরিকল্পিত ভূমিকা রয়েছে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করছে।
ভাষণে মাহসা আমিনির মৃত্যুর প্রসঙ্গ উল্লেখ করে খামেনি বলেন, ঘটনাটি ছিল বেদনাদায়ক এবং স্বাভাবিকভাবেই তা ইরানি সমাজকে শোকাহত করেছে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, একটি মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে যে সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়েছে, তা গ্রহণযোগ্য নয় এবং তা কোনোভাবেই ন্যায়সংগত আন্দোলন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। তাঁর মতে, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সহিংসতা উসকে দিয়ে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়েছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা দাবি করেন, মাহসা আমিনির মৃত্যুকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে বিদেশি শক্তি ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি দুর্বল করতে চেয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে চাপে ফেলা এবং জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করাই ছিল এসব তৎপরতার লক্ষ্য।
ভাষণের একটি বড় অংশজুড়ে খামেনি নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, দেশের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় নিরাপত্তা বাহিনী দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছে। তাঁর বক্তব্যে, বিক্ষোভের নামে যারা জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করছে, সরকারি ও ধর্মীয় স্থাপনায় হামলা চালাচ্ছে অথবা সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়াচ্ছে, তারা আসলে দেশের শত্রুদের স্বার্থ রক্ষা করছে।
খামেনি আরও বলেন, ইরানের সাধারণ মানুষ দেশের সার্বভৌমত্ব ও সংহতির পক্ষে রয়েছে। তাঁর দাবি অনুযায়ী, সাধারণ নাগরিকরা বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করে এবং তারা রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও জাতীয় ঐক্য রক্ষায় সচেতন। তিনি বলেন, দেশের জনগণ কখনোই এমন ষড়যন্ত্র সফল হতে দেবে না, যা ইরানের স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
ভাষণের শেষাংশে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা সতর্ক করে বলেন, ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপের কোনো সুযোগ নেই। তাঁর ভাষায়, যারা বিদেশি সহায়তায় দেশের শান্তি ও শৃঙ্খলা বিনষ্ট করার চেষ্টা করবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি জানান, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনী কঠোর অবস্থানে থাকবে।
খামেনি একই সঙ্গে বলেন, সাম্প্রতিক অস্থিরতা ইরানের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রাকে থামাতে পারবে না। তাঁর মতে, দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম এবং ভবিষ্যতেও ইরান তার নিজস্ব নীতিতে অটল থাকবে। তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন ইরানে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, সর্বোচ্চ নেতার এই বক্তব্য সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেছে এবং চলমান অস্থিরতার ব্যাখ্যায় বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছে।


