রাজনীতি ডেস্ক
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের ভোটারদের রাজনৈতিক মনোভাব, অংশগ্রহণের আগ্রহ, ইস্যুভিত্তিক অগ্রাধিকার এবং নির্বাচনি পরিবেশ সম্পর্কে একটি সাম্প্রতিক জনমত জরিপে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগ সমর্থকদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করছেন, পাশাপাশি ভোটারদের মধ্যে দুর্নীতি ও সুশাসন প্রধান উদ্বেগের বিষয় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
‘আনকভারিং দ্য পাবলিক পালস: ফাইন্ডিংস ফ্রম আ নেশনওয়াইড সার্ভে’ শীর্ষক এই মতামত জরিপটি যৌথভাবে পরিচালনা করেছে কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন (সিআরএফ) এবং বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যান্ড পাবলিক অপিনিয়ন স্টাডিজ। জরিপের মূল ফলাফল উপস্থাপন করেন সিআরএফের স্ট্র্যাটেজিক কো-অর্ডিনেটর জাকারিয়া পলাশ। প্রতিবেদনে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটারদের অংশগ্রহণের প্রবণতা, রাজনৈতিক অগ্রাধিকার, নেতৃত্ব সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি এবং নির্বাচনি পরিবেশ নিয়ে জনমত বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
জরিপে দেখা যায়, আওয়ামী লীগকে সমর্থন করেন এমন ভোটারদের প্রায় ৪৮ শতাংশ বিএনপির প্রতি ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন। পাশাপাশি আগে আওয়ামী লীগকে ভোট দেওয়া ভোটারদের মধ্যে ২৯ দশমিক ৯ শতাংশ জামায়াতের প্রতি এবং ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রতি সমর্থন জানানোর কথা বলেছেন। এসব তথ্য ভোটারদের রাজনৈতিক অবস্থান ও সমর্থনে পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
গবেষণাটি স্ট্রাটিফাইড র্যান্ডম স্যাম্পলিং পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়। ২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দুই ধাপে মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মোট ১১ হাজার ৩৮ জন ভোটার অংশগ্রহণ করেন। জরিপে অংশ নেওয়া ভোটারদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক বৈচিত্র্য বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভোটারদের অংশগ্রহণের আগ্রহ প্রসঙ্গে জরিপে দেখা গেছে, ৯০ শতাংশের বেশি ভোটার আগামী জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। প্রায় ৮ শতাংশ ভোটার এখনো অনিশ্চিত অথবা ভোটে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা করেননি। লিঙ্গ, বয়স, শিক্ষা কিংবা বসবাসের স্থানভেদে ভোটদানের আগ্রহে উল্লেখযোগ্য কোনো পার্থক্য পাওয়া যায়নি, যা ভোটার অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে একটি সামগ্রিক আগ্রহের চিত্র তুলে ধরে।
ভোটারদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে উঠে এসেছে দুর্নীতি ও সুশাসনের প্রশ্ন। জরিপে অংশ নেওয়া ৬৭ দশমিক ৩ শতাংশ ভোটার দুর্নীতিকে দেশের প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। অন্যদিকে ধর্মীয় বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করেছেন তুলনামূলকভাবে কমসংখ্যক ভোটার, যার হার ৩৫ দশমিক ৯ শতাংশ। এই তথ্য থেকে বোঝা যায়, ভোটারদের বড় অংশ নীতিগত ও শাসনসংক্রান্ত বিষয়কে প্রাধান্য দিচ্ছেন।
নেতৃত্বের ধরন প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভোটাররা ব্যক্তিগত ক্যারিশমার চেয়ে জনদরদি, দায়িত্বশীল ও কার্যকর নেতৃত্বকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। রাজনৈতিক তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে সবচেয়ে প্রভাবশালী মাধ্যম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অধিকাংশ ভোটার জানিয়েছেন, তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে একাধিক তথ্যসূত্র ব্যবহার করেন।
নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে জরিপে ভোটারদের উদ্বেগের বিষয়ও উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, নির্বাচন ব্যবস্থাপনার চেয়ে ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিয়ে ভোটারদের শঙ্কা তুলনামূলকভাবে বেশি। ভয়ভীতি প্রদর্শন, জালিয়াতি ও ব্যালট দখলের আশঙ্কা প্রায় সব রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের মধ্যেই বিদ্যমান বলে জরিপে প্রতিফলিত হয়েছে।
জরিপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নতুন ভোটারদের রাজনৈতিক পছন্দ। ২০০৮ সালের পর প্রথমবার ভোট দিতে যাওয়া ভোটারদের মধ্যে ৩৭ দশমিক ৪ শতাংশ জামায়াতকে পছন্দ করার কথা জানিয়েছেন। ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে অধিকাংশ ভোটার প্রার্থীকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হিসেবে দেখছেন। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভোটার জানিয়েছেন, তারা ভোট দেওয়ার সময় প্রার্থী অথবা প্রার্থী ও দল—উভয় বিষয় বিবেচনায় নেন। এর মধ্যে ৩০ দশমিক ২ শতাংশ শুধু প্রার্থীকে এবং ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ প্রার্থী ও দল উভয়কেই গুরুত্ব দেন।
এই জরিপের ফলাফল থেকে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে ভোটারদের মনোভাব, উদ্বেগ ও অগ্রাধিকার সম্পর্কে একটি বিস্তৃত চিত্র পাওয়া যায়, যা রাজনৈতিক দল ও নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।


