বাংলাদেশে ব্যবসায়িক পরিবেশে নৈতিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের চাহিদা বাড়ছে

বাংলাদেশে ব্যবসায়িক পরিবেশে নৈতিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের চাহিদা বাড়ছে

অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক

দেশে এলডিসি (অতি কম উন্নয়নশীল দেশ) উত্তরণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা অর্জনের জন্য ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ উন্নয়ন, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে ন্যায্যতা ও নৈতিকতার চর্চা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসা বিশ্লেষকরা।

আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর মতিঝিলে ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) কার্যালয়ে ‘বাংলাদেশে ব্যবসায়িক পরিবেশ: নৈতিক চর্চার ইস্যু ও চ্যালেঞ্জসমূহ’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় এ বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। সভাটি এফবিসিসিআই এবং ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম অব বাংলাদেশ (আইবিএফবি) যৌথভাবে আয়োজন করে।

সভায় সভাপতিত্ব করেন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. আবদুর রহিম খান। প্রধান প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি বলেন, সফলভাবে এলডিসি উত্তরণ এবং টেকসই অর্থনীতি গড়ে তুলতে হলে ‘বিজনেস প্রসেস রি-ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় হ্রাস করতে হবে এবং সরকারি সংস্থাগুলোর সেবার মান ও কার্যগত গতি বৃদ্ধি করতে হবে। সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে নৈতিকতার চর্চা প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম ব্যবসায়ীদের লাইসেন্স প্রাপ্তি, নবায়ন, নিবন্ধন, কাস্টমসসহ বিভিন্ন সরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে বিদ্যমান জটিলতা ও প্রতিবন্ধকতার সার্বিক চিত্রও উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, প্রশাসনিক জটিলতা ও অনৈতিক আচরণ বিনিয়োগে প্রভাব ফেলে এবং ব্যবসা পরিচালনায় অতিরিক্ত ব্যয় ও সময়ের ক্ষতি ঘটায়।

উন্মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণকারী ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ বলেন, দেশে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে সরকারি এজেন্সিগুলোর কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। এ লক্ষ্যে ডিজিটালাইজেশন, অটোমেশন এবং সিঙ্গল উইন্ডো ব্যবস্থা কার্যকর করার ওপর তারা গুরুত্ব দেন।

আইবিএফবি’র পরিচালক এম.এস. সিদ্দিকী বলেন, অনেক ক্ষেত্রে সরকার কর্তৃক প্রণীত আইন ও বিধিমালা ব্যবসা সহজীকরণ নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ে, যা বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করে। এ কারণে আইন ও নীতিমালার সমন্বয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রয়োজন।

দুর্নীতি দমন কমিশনের সচিব মোহাম্মদ খালেদ রহীম বলেন, সরকারি দপ্তরগুলোর কিছু পদ্ধতিগত জটিলতা রয়েছে, তবে সেগুলো সহজীকরণের যথেষ্ট সুযোগ আছে। তিনি ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানান, সেবা গ্রহণের সময় হয়রানির শিকার হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দাখিল করুন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মো. নজরুল ইসলাম বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার একটি জটিল প্রক্রিয়া হলেও সরকারের ইতিমধ্যে কিছু সংস্কার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তবে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আচরণগত সংস্কার নিশ্চিত করা, যা নৈতিক ব্যবসায়িক চর্চাকে প্রতিষ্ঠা করবে।

সভায় স্বাগত বক্তব্যে আইবিএফবি’র সভাপতি লুৎফুন্নিসা সাউদিয়া খান বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি, টেকসই উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করতে নৈতিক ব্যবসায়িক চর্চা অপরিহার্য। উদ্যোক্তাদের যে চ্যালেঞ্জগুলো রয়েছে, তা কেবল আইন প্রণয়ন বা বিধিমালা দিয়ে সমাধান সম্ভব নয়; এজন্য প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা, উন্মুক্ত সংলাপ এবং অংশীদারিত্বমূলক দায়বদ্ধতা।

সভা সমাপনীতে এফবিসিসিআই’র প্রশাসক মো. আবদুর রহিম খান বলেন, ব্যবসার পরিবেশ সহজীকরণে বেসরকারি খাত থেকে যে সুপারিশগুলো এসেছে, তা এফবিসিসিআই সরকারের কাছে উপস্থাপন করবে। একই সঙ্গে তিনি উদ্যোক্তাদের ন্যায্য মুনাফা অর্জনের পাশাপাশি সামাজিক, নৈতিক ও মানবিক দায়বদ্ধতা পালনের এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।

সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন এফবিসিসিআই’র সাবেক পরিচালকবৃন্দ, সাধারণ পরিষদের সদস্যবৃন্দ, এফবিসিসিআই’র মহাসচিব মো. আলমগীর, ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স উইংয়ের প্রধান মোঃ জাফর ইকবাল, এফবিসিসিআই সেইফটি কাউন্সিলের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবু নাঈম মো. শাহিদউল্লাহ, আইবিএফবি’র নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন চেম্বার ও অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিবৃন্দ।

জাতীয় শীর্ষ সংবাদ