বৈশ্বিক বাজারে মূল্যবান ধাতু ও জ্বালানি পণ্যের দামে উল্লেখযোগ্য পতন

বৈশ্বিক বাজারে মূল্যবান ধাতু ও জ্বালানি পণ্যের দামে উল্লেখযোগ্য পতন


অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক

বৈশ্বিক পণ্যবাজারে স্বর্ণ, রুপা, অপরিশোধিত তেল ও তামাসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের দামে একযোগে উল্লেখযোগ্য পতন লক্ষ্য করা গেছে। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হওয়া, মার্কিন ডলারের শক্তিশালী অবস্থান এবং বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি গ্রহণের কৌশলে পরিবর্তনের কারণে এই দরপতন ঘটেছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

গত বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বাজারে লেনদেনের সময় সবচেয়ে বড় ধস নামে রুপার দামে। এক পর্যায়ে রুপার মূল্য প্রায় ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে অন্যতম বড় দরপতন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একই সময়ে স্বর্ণ, অপরিশোধিত তেল এবং তামার দাম গড়ে প্রায় ২ শতাংশ হ্রাস পায়। একাধিক পণ্যে একসঙ্গে এই ধরনের পতন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সতর্কতা বাড়িয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্বের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য বৈঠকের খবরে বৈশ্বিক রাজনৈতিক উত্তেজনা কিছুটা কমেছে। মধ্যপ্রাচ্য ও বৃহৎ অর্থনীতিগুলোর মধ্যে সংঘাতের ঝুঁকি কমার ইঙ্গিত পাওয়ায় নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে পরিচিত স্বর্ণ ও রুপার প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ হ্রাস পেয়েছে। এর ফলে অনেক বিনিয়োগকারী পূর্ববর্তী মুনাফা তুলে নিতে এসব সম্পদ বিক্রি শুরু করেন, যা দামের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, চলতি সপ্তাহে মূল্যবান ধাতুসহ বিভিন্ন পণ্যের দামে অস্বাভাবিক ওঠানামা দেখা গেছে। তাদের মতে, এই দরপতন মূলত অস্থির বাজার পরিস্থিতিরই প্রতিফলন, যেখানে স্বল্প সময়ের মধ্যে লাভ তুলে নেওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়লে বিনিয়োগকারীরা সাধারণত দ্রুত সিদ্ধান্ত নেন, যার প্রভাব পণ্যের দামে তাৎক্ষণিকভাবে পড়ে।

অন্যদিকে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের সুদের হার সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের আগমুহূর্তে এশীয় লেনদেনে মার্কিন ডলার তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল। ডলার সূচক দুই সপ্তাহের সর্বোচ্চ অবস্থানের কাছাকাছি অবস্থান করায় অন্যান্য মুদ্রার বিনিয়োগকারীদের জন্য পণ্য কেনা ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। সাধারণত ডলার শক্তিশালী হলে পণ্যের দাম চাপের মুখে পড়ে, কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে অধিকাংশ পণ্য ডলারে মূল্যায়িত হয়।

সপ্তাহের শুরুতেও পণ্যবাজারে চাপ দেখা যায়, যখন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্বে সম্ভাব্য পরিবর্তন এবং কঠোর মুদ্রানীতির আশঙ্কা তৈরি হয়। উচ্চ সুদের সম্ভাবনা বিনিয়োগকারীদের ডলারমুখী করে তোলে এবং সুদবিহীন সম্পদ হিসেবে স্বর্ণ ও রুপার আকর্ষণ কমিয়ে দেয়। এর ধারাবাহিকতায় মূল্যবান ধাতুর বাজারে বিক্রির চাপ আরও বেড়ে যায়।

জ্বালানি বাজারেও একই ধরনের প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ওমানে বৈঠকে বসতে সম্মত হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি হ্রাস পেয়েছে। এই খবরে তেলের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা কমে যায় এবং অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ২ শতাংশ কমে যায়। দীর্ঘদিন ধরে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি তেলের দামে প্রভাব ফেললেও সাম্প্রতিক উন্নয়ন বাজারকে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে।

তামার বাজারেও চাপ অব্যাহত রয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ এবং লন্ডন মেটাল এক্সচেঞ্জের গুদামে মজুত বৃদ্ধির খবরে বিনিয়োগকারীরা সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। যদিও এর আগে চীন কৌশলগতভাবে তামার মজুত বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়ায় দাম কিছুটা বেড়েছিল, তবে সাম্প্রতিক মজুত বৃদ্ধির তথ্য সেই ইতিবাচক প্রভাবকে ম্লান করে দিয়েছে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে তারল্য তুলনামূলকভাবে কম থাকায় একটি খাতে বিক্রি শুরু হলে তা দ্রুত অন্য খাতেও ছড়িয়ে পড়ছে। এর ফলে দরপতনের মাত্রা আরও বেড়ে যাচ্ছে। এই প্রবণতার প্রভাব শুধু পণ্যবাজারেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; মূল্যবান ধাতু, কিছু বিকল্প বিনিয়োগ এবং আঞ্চলিক শেয়ারবাজারেও এর প্রতিফলন দেখা গেছে।

তবে সব পণ্যের ক্ষেত্রে দরপতনের চিত্র একরকম নয়। অন্যান্য পণ্যের তুলনায় সয়াবিনের দাম বেড়ে দুই মাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে চীন সয়াবিন আমদানির বিষয়টি বিবেচনা করছে—এমন প্রত্যাশায় বাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। বিপরীতে অতিরিক্ত মজুতের কারণে লৌহ আকরিকের দামও প্রায় ২ শতাংশ কমেছে। সামগ্রিকভাবে বৈশ্বিক পণ্যবাজার বর্তমানে রাজনৈতিক ও মুদ্রানীতিগত পরিবর্তনের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল অবস্থায় রয়েছে।

অর্থ বাণিজ্য শীর্ষ সংবাদ