আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইউক্রেন ও রাশিয়ার চলমান যুদ্ধ আগামী জুনের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র একটি নতুন প্রস্তাব দিয়েছে। এ প্রস্তাবের অংশ হিসেবে আগামী সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে দুই পক্ষের প্রতিনিধিদের মধ্যে সরাসরি আলোচনা আয়োজনের কথাও বলা হয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি কিয়েভে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ তথ্য জানান।
জেলেনস্কির বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবারের মতো একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে যুদ্ধের অবসান ঘটানোর বিষয়ে স্পষ্ট উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র চাইছে জুনের মধ্যেই আলোচনার মাধ্যমে একটি সমাধানে পৌঁছাতে। সম্ভাব্য বৈঠকটি এক সপ্তাহের মধ্যে অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে সবচেয়ে প্রাণঘাতী সংঘাত হিসেবে বিবেচিত এই যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন কূটনৈতিক তৎপরতা সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে জোরদার হয়েছে। তবে যুদ্ধ বন্ধের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভূখণ্ডগত বিরোধ। এ বিষয়ে মস্কো ও কিয়েভের অবস্থান এখনো একেবারেই বিপরীত।
বর্তমানে ইউক্রেনের প্রায় ২০ শতাংশ ভূখণ্ড রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। রাশিয়া যেকোনো শান্তিচুক্তির শর্ত হিসেবে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় দোনেৎস্ক অঞ্চলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দাবি করছে। মস্কোর পক্ষ থেকে এ-ও জানানো হয়েছে, আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না এলে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে ওই অঞ্চল দখল সম্পন্ন করার চেষ্টা করা হবে।
অন্যদিকে ইউক্রেনের অবস্থান ভিন্ন। কিয়েভের মতে, ভূখণ্ড ছাড় দেওয়ার মাধ্যমে কোনো চুক্তি হলে তা ভবিষ্যতে রাশিয়াকে আরও আগ্রাসী হওয়ার সুযোগ করে দেবে। ইউক্রেন সরকার মনে করে, একবার ভূখণ্ড ছাড় দিলে তা রাশিয়ার জন্য একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করবে, যা ভবিষ্যতে নতুন করে হামলার ঝুঁকি বাড়াবে। এ কারণে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ছাড়া এবং ভবিষ্যৎ আগ্রাসন প্রতিরোধে অকার্যকর এমন কোনো চুক্তিতে ইউক্রেন স্বাক্ষর করবে না বলে জানিয়েছে দেশটির নেতৃত্ব।
প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি বলেন, জানুয়ারি থেকে মধ্যপ্রাচ্যের আবুধাবিতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে দুই দফা আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব আলোচনার ফলে বড় পরিসরে বন্দি বিনিময় সম্ভব হলেও ভূখণ্ড প্রশ্নে কোনো অগ্রগতি হয়নি। উভয় পক্ষই আলোচনাগুলোকে কঠিন ও জটিল বলে বর্ণনা করেছে।
জেলেনস্কি একাধিকবার অভিযোগ করেছেন, আলোচনার বিভিন্ন পর্যায়ে ইউক্রেনের ওপর তুলনামূলকভাবে বেশি ছাড় দেওয়ার চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। তাঁর মতে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইউক্রেন আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, অথচ বাস্তবতায় কিয়েভকেই বেশি আপস করতে বলা হচ্ছে।
ইউক্রেনের প্রস্তাব অনুযায়ী, বর্তমান যুদ্ধরেখা বরাবর সংঘাত স্থগিত রেখে আলোচনার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধানের পথে এগোনো যেতে পারে। তবে রাশিয়া এখন পর্যন্ত এই প্রস্তাবে সম্মতি জানায়নি। বরং মস্কো ভূখণ্ডগত দাবিকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রাখার ওপর জোর দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রস্তাব যুদ্ধ বন্ধের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক উদ্যোগ হলেও এর সাফল্য নির্ভর করবে উভয় পক্ষের অবস্থান কতটা নমনীয় হয় তার ওপর। ফ্লোরিডায় প্রস্তাবিত বৈঠক অনুষ্ঠিত হলে তা যুদ্ধ শুরুর পর প্রথম কোনো উচ্চপর্যায়ের আলোচনার নতুন অধ্যায় হতে পারে। তবে ভূখণ্ড ও নিরাপত্তা ইস্যুতে সমঝোতা ছাড়া দ্রুত যুদ্ধের অবসান কতটা সম্ভব হবে, সে বিষয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।


