রাজনীতি ডেস্ক
নির্বাচনের পর জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে কোনো ধরনের ঐক্য সরকার গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান। একই সঙ্গে তিনি আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির এককভাবে সরকার গঠনের মতো পর্যাপ্ত আসন অর্জনের বিষয়ে আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেছেন। শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীতে নিজের দলীয় কার্যালয়ে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।
তারেক রহমান জানান, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে সরকার গঠনের প্রশ্নই ওঠে না। তাঁর মতে, একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার ও বিরোধী দলের ভূমিকা স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন। জামায়াতে ইসলামী যদি সংসদে আসন পায়, তবে তারা বিরোধী দল হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে—এমনটাই প্রত্যাশা বিএনপির। তিনি বলেন, বিরোধী দল শক্তিশালী ও দায়িত্বশীল হলে সংসদীয় গণতন্ত্র আরও কার্যকর হয়।
প্রায় দুই দশক যুক্তরাজ্যে অবস্থানের পর গত ডিসেম্বর মাসে দেশে ফেরেন তারেক রহমান। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাঁর দেশে ফেরা জাতীয় রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। শেখ হাসিনা বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ছিলেন। সাম্প্রতিক গণআন্দোলনের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য রদবদল ঘটে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হচ্ছে ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামীকে। একসময় নিষিদ্ধ থাকা দলটি বর্তমানে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় রয়েছে। অতীতে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী একসঙ্গে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত দেশ শাসন করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াত দেশের স্থিতিশীলতার স্বার্থে পুনরায় ঐক্য সরকারের আগ্রহ প্রকাশ করলেও বিএনপি সে প্রস্তাবে ইতিবাচক নয় বলে স্পষ্ট করেছেন তারেক রহমান।
বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা জানিয়েছেন, ৩০০ আসনের জাতীয় সংসদে দলটি দুই–তৃতীয়াংশের বেশি আসনে বিজয়ী হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী। নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীরা সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ২৯২টি আসনে। বাকি আসনগুলোতে লড়ছেন দলটির মিত্র জোটের প্রার্থীরা। যদিও সম্ভাব্য আসনসংখ্যা নিয়ে নির্দিষ্ট কোনো হিসাব দেননি তারেক রহমান, তবে তিনি বলেছেন, সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে বিএনপি সক্ষম হবে বলে তারা বিশ্বাস করেন।
বর্তমান নির্বাচনী পরিস্থিতিতে বিভিন্ন জনমত জরিপে বিএনপির এগিয়ে থাকার ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও ইসলামপন্থী দলগুলোর সমন্বয়ে গঠিত জোটের কাছ থেকে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনার কথাও আলোচনায় রয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করা তরুণ নেতৃত্বাধীন দলগুলোর উপস্থিতি নির্বাচনী সমীকরণকে জটিল করে তুলতে পারে।
পররাষ্ট্রনীতি প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ কোনো নির্দিষ্ট দেশের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বকে অগ্রাধিকার দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালনা করা হবে। তিনি জানান, দেশের প্রায় ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিশ্চিত করতে যেসব অংশীদার বাস্তবসম্মত ও উপযোগী প্রস্তাব দেবে, তাদের সঙ্গেই সম্পর্ক জোরদার করা হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং তরুণদের জন্য সুযোগ তৈরিই হবে সম্ভাব্য সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
রাজনীতিতে অংশগ্রহণের অধিকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জনগণ যাকে গ্রহণ করবে এবং যাকে সমর্থন দেবে, তার রাজনীতি করার অধিকার রয়েছে। কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ জনগণের গ্রহণযোগ্যতার ওপর নির্ভর করে—এমন অবস্থান তুলে ধরেন তিনি।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও মত দেন বিএনপি চেয়ারম্যান। বর্তমানে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর বিষয়ে তিনি বলেন, তাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসনই একমাত্র টেকসই সমাধান। তবে তা অবশ্যই নিরাপদ ও সম্মানজনক পরিবেশ নিশ্চিত হওয়ার পরই হতে হবে। যতদিন পর্যন্ত সে পরিস্থিতি সৃষ্টি না হবে, ততদিন মানবিক কারণে তারা বাংলাদেশে অবস্থান করতে পারে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সব মিলিয়ে, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সরকার গঠন, বিরোধী রাজনীতি, পররাষ্ট্রনীতি ও মানবিক সংকট—সব ক্ষেত্রেই বিএনপি তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত।


