চট্টগ্রাম — জেলা প্রতিনিধি
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ইজারা না দেওয়ার দাবিতে ‘চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ’ রোববার (৮ জানুয়ারি) সকাল ৮টা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট শুরু করেছে। কর্মসূচির কারণে বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম কার্যত বন্ধ রয়েছে। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে বন্দরের ৪ নম্বর গেটের সামনে পুলিশ সতর্ক অবস্থানে ছিল। বন্দরের ভেতরে যানবাহন প্রবেশের সংখ্যা নেই বললেই চলে।
সরেজমিন পরিস্থিতি অনুযায়ী, সকাল ৮টা থেকে জেটি, ইয়ার্ড, টার্মিনাল, প্রশাসনিক ভবন ও বহির্নোঙর (আউটার লাইটারেজ) এলাকায় পণ্য খালাস ও পরিচালনা কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। কর্মবিরতির কারণে চট্টগ্রাম বন্দর দেশের প্রধান বন্দরগুলোর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারছে না। পরিস্থিতি সামাল দিতে বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রায় ২০০ সাধারণ কর্মচারী ও শ্রমিককে সকাল সাড়ে ৯টায় বন্দর ভবনের সম্মেলন কক্ষে জরুরি সভায় উপস্থিত থাকার নির্দেশ দিয়েছে। তবে আন্দোলনকারীরা এই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছেন।
ধর্মঘট ঘোষণার আগে শনিবার দুপুরে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে বন্দর রক্ষা পরিষদের সমন্বয়ক মো. ইব্রাহিম খোকন কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তিনি জানান, পরিষদের প্রধান চারটি দাবি হলো—চেয়ারম্যান এস এম মনিরুজ্জামানকে প্রত্যাহার, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে নেওয়া শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বাতিল, শ্রমিক নেতাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাসহ সব ধরনের আইনি হয়রানি বন্ধ করা এবং এনসিটি ইজারা প্রদান প্রক্রিয়া বাতিল।
ইব্রাহিম খোকন বলেন, “সকাল ৮টা থেকে সব ধরনের কাজ বন্ধ রয়েছে। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি চলবে। গতকাল থেকে আমাদের নেতাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্বারা হয়রানি ও হুমকি দেওয়া হচ্ছে। দুই শ্রমিক নেতা শামসু মিয়া টুকু ও আবুল কালাম আজাদকে প্রশাসনের লোক পরিচয় দিয়ে তুলে নেওয়া হয়েছে। এইভাবে ভয় দেখিয়ে আন্দোলন দমানো যাবে না।”
পরিষদের আরেক সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবির জানান, গত ৩১ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দৈনিক আট ঘণ্টা এবং ৩ থেকে ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টানা কর্মবিরতি পালন করেছেন তারা। নৌ উপদেষ্টার আশ্বাসে শুক্রবার ও শনিবার কর্মসূচি স্থগিত রাখা হয়েছিল। কিন্তু প্রতিশ্রুতি পূরণ না হওয়ায় এবার আরও কঠোর কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার (বন্দর) মো. আমিরুল ইসলাম জানান, বন্দরের নিরাপত্তা বিষয়ে তারা সব সময় সতর্ক অবস্থানে আছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। তিনি জানান, শ্রমিকদের শান্তিপূর্ণ দাবি-দাওয়া ও ধর্মঘটের মধ্যে নিরাপত্তা বজায় রাখা চট্টগ্রাম পুলিশের মূল লক্ষ্য।
এ পরিস্থিতিতে বন্দর কার্যক্রমে ক্ষতি ও জটিলতা দেখা দিয়েছে। বন্দরের পণ্য খালাস এবং আমদানি-রফতানি প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দীর্ঘস্থায়ী ধর্মঘটের কারণে বন্দর অপারেশনে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে, যা দেশের আমদানি-রফতানি খাতে সরাসরি প্রভাব ফেলবে।
চট্টগ্রাম বন্দর দেশের প্রধান বন্দরগুলোর মধ্যে অন্যতম। এটি দেশের ৯০ শতাংশ সামুদ্রিক বাণিজ্যের ধ্বজা বহন করে। বন্দরে যে কোনো অপারেশনাল ব্যাঘাত সরাসরি বাণিজ্য ও লজিস্টিক খাতকে প্রভাবিত করে, যা দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
বর্তমান ধর্মঘটের প্রেক্ষাপটে বন্দর কর্তৃপক্ষ ও শ্রমিক নেতাদের মধ্যে সমঝোতার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। যদি সমস্যা সমাধান না হয়, তবে বন্দর কার্যক্রম বন্ধ থাকায় দেশের আমদানি-রফতানি ব্যবস্থায় বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।


