থাইল্যান্ডের নির্বাচনে ভূমজাইথাইয়ের বড় জয়, জোট সরকার গঠনের উদ্যোগ অনুতিনের

থাইল্যান্ডের নির্বাচনে ভূমজাইথাইয়ের বড় জয়, জোট সরকার গঠনের উদ্যোগ অনুতিনের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

জাতীয়তাবাদী আবেগকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক সাধারণ নির্বাচনে বড় ধরনের সাফল্য পাওয়ার পর থাইল্যান্ডে জোট সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করতে যাচ্ছেন দেশটির তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল। সোমবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। তবে নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত ফল প্রকাশের আগে এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো নির্দিষ্ট মন্তব্য করতে রাজি হননি অনুতিন।

কম্বোডিয়ার সঙ্গে সীমান্তে টানা উত্তেজনা ও প্রাণঘাতী সংঘর্ষের প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে সামরিকপন্থী ও রাজতন্ত্রসমর্থক ভূমজাইথাই পার্টি তাদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ আসনসংখ্যা অর্জন করেছে। গত বছর সীমান্তে দুই দফা সংঘর্ষে উভয় দেশের বহু মানুষ নিহত হন এবং বাস্তুচ্যুত হন প্রায় ১০ লাখ মানুষ। এই পরিস্থিতিতে সীমান্ত নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নটি নির্বাচনী প্রচারে মুখ্য হয়ে ওঠে।

রক্ষণশীল রাজনৈতিক অবস্থান ও জাতীয়তাবাদী বক্তব্যের মাধ্যমে ভূমজাইথাই উল্লেখযোগ্য জনসমর্থন আদায় করে। স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুকে সামনে রেখে দলটি ভোটারদের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, দলটি প্রায় ২০০টি আসনে এগিয়ে রয়েছে। তবে ৫০০ আসনের নিম্নকক্ষে এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা তারা অর্জন করতে পারেনি।

নির্বাচনে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সংস্কারপন্থী পিপলস পার্টি, যাদের সম্ভাব্য আসনসংখ্যা প্রায় ১২০। তৃতীয় অবস্থানে থাকা ফেউ থাই দল এবারের নির্বাচনে উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে পড়েছে। নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক ফলাফলে দেখা যায়, ২০২৩ সালের নির্বাচনের তুলনায় পিপলস পার্টি ও ফেউ থাই—উভয় দলের ভোটের হার কমেছে। এতে ভোটারদের একটি বড় অংশের রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

বিশ্লেষকদের মতে, কম্বোডিয়া সীমান্ত পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগে ফেউ থাইয়ের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি জনসমর্থন কমেছে। দলটির নেতা পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রা সীমান্ত সংকট ঘিরে বিতর্ক ও নৈতিকতা লঙ্ঘনের অভিযোগে প্রধানমন্ত্রীর পদ হারান। পরে সাংবিধানিক আদালতের আদেশে তাকে দায়িত্ব থেকে বরখাস্ত করা হয়।

ফেউ থাইয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রা বর্তমানে দুর্নীতির মামলায় এক বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। রাজনৈতিক অঙ্গনে ধারণা রয়েছে, ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে তার মুক্তির বিষয়টি আলোচনায় আসতে পারে। তবে সরকারিভাবে এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।

ভূমজাইথাইয়ের বিজয়ের পেছনে দলটির রাজতন্ত্রের প্রতি আনুগত্য ও জাতীয়তাবাদী অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। পাশাপাশি ফেউ থাইয়ের বিরুদ্ধে ওঠা একাধিক বিতর্ক ও নেতৃত্ব সংকটও রক্ষণশীলদের জন্য সুবিধাজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

নির্বাচনের পরবর্তী ধাপে সরকার গঠনই এখন থাইল্যান্ডের রাজনীতির প্রধান আলোচ্য বিষয়। যদিও অতীতে সীমান্ত বিরোধ নিয়ে ফেউ থাই ও ভূমজাইথাইয়ের মধ্যে টানাপোড়েন ছিল, তবুও জোট সরকার গঠনের ক্ষেত্রে ফেউ থাইকে সম্ভাব্য অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, দ্রুত জোট চূড়ান্ত করে ক্ষমতায় স্থিতিশীলতা আনতে চাইবে ভূমজাইথাই।

সেপ্টেম্বরে তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর অনুতিন সীমান্ত পরিস্থিতি মোকাবিলায় সশস্ত্র বাহিনীকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুমতি দেন। ডিসেম্বর মাসে সর্বশেষ দফা সংঘর্ষে থাই সেনাবাহিনী কয়েকটি বিতর্কিত এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয়। বর্তমানে সেখানে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে।

থাইল্যান্ডের রাজনৈতিক ইতিহাসে সামরিক অভ্যুত্থান, গণআন্দোলন ও বিচারিক হস্তক্ষেপের ঘটনা নতুন নয়। ২০১৪ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর সেনা শাসনের অধীনে প্রণীত সংবিধানে মনোনীত সিনেটকে ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়। এই সিনেট সরাসরি নির্বাচিত নয়, যা দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কের বিষয়।

সর্বশেষ গণভোটে প্রায় ৬০ শতাংশ ভোটার নীতিগতভাবে সংবিধান সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে সেখানে কোনো নির্দিষ্ট সংস্কার প্রস্তাব ছিল না। ফলে ভবিষ্যৎ সংস্কারের দিকনির্দেশনা নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বর্তমান সংসদের ওপর পড়বে। ভূমজাইথাইয়ের রক্ষণশীল রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে বড় ধরনের সাংবিধানিক পরিবর্তন হবে কি না, সে বিষয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ