যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধি ছাড়বে না ইরান: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধি ছাড়বে না ইরান: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরান কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধির অধিকার ত্যাগ করবে না বলে স্পষ্ট অবস্থান জানিয়েছে দেশটির সরকার। রোববার তেহরানে এক আন্তর্জাতিক ফোরামে বক্তব্য দিতে গিয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হুমকি বা রাজনৈতিক চাপ ইরানকে তার নীতিগত অবস্থান থেকে সরে যেতে বাধ্য করতে পারবে না। তিনি বলেন, যুদ্ধের হুমকিতে ইরান ভীত নয় এবং নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচি পরিচালনার অধিকার রক্ষায় দেশটি অটল থাকবে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি জানান, ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে তেহরানের আস্থার ঘাটতি রয়েছে। তাঁর ভাষায়, অতীত অভিজ্ঞতার কারণে যুক্তরাষ্ট্র আলোচনাকে কতটা গুরুত্ব সহকারে নিচ্ছে, সে বিষয়ে ইরানের সন্দেহ রয়েছে। তিনি বলেন, আলোচনার নামে চাপ সৃষ্টি বা শর্ত চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা ইরানের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়। ইরানের মতে, পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে এবং তা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী দেশটির বৈধ অধিকার।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরমাণু ইস্যুতে উত্তেজনা নতুন নয়। গত বছরের জুনে ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে ১২ দিনের সংঘর্ষের পর এই উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। ওই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র সীমিত সময়ের জন্য ইসরাইলের পক্ষে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়েছিল। দীর্ঘ বিরতির পর চলতি মাসে ওমানে প্রথমবারের মতো পুনরায় আলোচনা শুরু করেছে তেহরান ও ওয়াশিংটন। আলোচনার মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং এর বিনিময়ে দেশটির ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল বা প্রত্যাহারের সম্ভাবনা।

ইরান দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দেশটির অর্থনীতি ও সাধারণ জনগণের জীবনযাত্রায় মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। আব্বাস আরাকচি বলেন, এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারই পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পারস্পরিক আস্থা তৈরির একটি বাস্তব পদক্ষেপ হতে পারে। তাঁর মতে, নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখে আস্থা ও সহযোগিতার কথা বলা বাস্তবসম্মত নয়।

আলোচনার পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতাও জোরদার করেছে তেহরান। পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বা সম্ভাব্য আলোচনার বিষয়ে ইরান নিয়মিতভাবে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে পরামর্শ করছে। তিনি এই দুই দেশকে ‘কৌশলগত অংশীদার’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ইস্যুতে সমন্বিত অবস্থান ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র আরব সাগরে তাদের একটি বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন করেছে, যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে বিভিন্ন মহলে। তবে আব্বাস আরাকচি বলেন, মার্কিন নৌবাহিনীর এই ধরনের সামরিক উপস্থিতি ইরানকে ভীত করে না। তাঁর মতে, সামরিক চাপ দিয়ে কোনো রাজনৈতিক সমাধান চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়।

পরমাণু ইস্যুর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে তেহরানের সমর্থনের বিষয়টি আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করতে চায়। তবে ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, পারমাণবিক কর্মসূচির বাইরে অন্য কোনো ইস্যু আলোচনার টেবিলে আনার বিষয়ে তারা সম্মত নয়। বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে তারা জাতীয় প্রতিরক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখছে এবং এ ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দিতে রাজি নয়।

পশ্চিমা দেশগুলো এবং মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত ইসরাইল দাবি করে আসছে, ইরান গোপনে পারমাণবিক বোমা তৈরির চেষ্টা করছে। তবে তেহরান এই অভিযোগ বারবার অস্বীকার করেছে। আব্বাস আরাকচি বলেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সামরিক নয় এবং দেশটি কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায় না। তাঁর ভাষায়, ইরানের প্রকৃত শক্তি হলো বড় শক্তিগুলোর অন্যায় চাপের বিরুদ্ধে ‘না’ বলার সক্ষমতা।

এই প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ওমানে শুরু হওয়া আলোচনা ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে পারস্পরিক অবিশ্বাস, নিষেধাজ্ঞা ও নিরাপত্তা ইস্যুতে কঠোর অবস্থানের কারণে দ্রুত কোনো সমাধানে পৌঁছানো কঠিন হবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ