আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী মার্কিন পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর জন্য নতুন নিরাপত্তা নির্দেশিকা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে জাহাজগুলোকে ইরানের আঞ্চলিক জলসীমা থেকে যথাসম্ভব দূরে থাকার এবং চলাচলের সময় নির্দিষ্ট নৌপথ অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, নৌচলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এ নির্দেশনার মূল উদ্দেশ্য।
সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের মেরিটাইম অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (মার্যাড) এই নির্দেশনা জারি করে। এতে মার্কিন পতাকাবাহী জাহাজের ক্যাপ্টেনদের ইরানি নিরাপত্তা বাহিনীকে জাহাজে ওঠার অনুমতি না দিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালী দিয়ে পূর্বমুখী যাত্রার ক্ষেত্রে জাহাজগুলোকে ওমানের আঞ্চলিক সমুদ্রের কাছাকাছি নৌপথ ব্যবহার করার সুপারিশ করা হয়েছে। নির্দেশনায় বলা হয়, ইরানের আঞ্চলিক সমুদ্র এড়িয়ে চললে সম্ভাব্য ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে।
মার্যাডের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালী একটি সংবেদনশীল ও কৌশলগত জলপথ। এখানে সাম্প্রতিক সময়ের আঞ্চলিক উত্তেজনা ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে বাণিজ্যিক নৌযানের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। সে কারণে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনায় জাহাজ পরিচালনাকারীদের নিয়মিত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, নিরাপত্তা সতর্কতা জোরদার এবং সংশ্লিষ্ট নৌবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
এই নির্দেশনা এমন এক সময়ে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কয়েক সপ্তাহ ধরে তীব্র বাক্যবিনিময় ও পারস্পরিক হুমকি পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছিল। ওই উত্তেজনার মধ্যেই সম্প্রতি ওমানে দুই দেশের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, আলোচনার লক্ষ্য ছিল উত্তেজনা প্রশমন এবং সম্ভাব্য সংঘাত এড়ানোর উপায় খোঁজা। যদিও আলোচনার বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি, তবে এর পরপরই নৌচলাচল সংক্রান্ত এই সতর্কতা জারি করা হলো।
হরমুজ প্রণালী বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের একটি বড় অংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে যেকোনো অস্থিরতা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি বাড়লে বিমা ব্যয় বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যাঘাত এবং জ্বালানির দামে ওঠানামার আশঙ্কা থাকে।
ইতিহাসে দেখা গেছে, ভূরাজনৈতিক সংঘাতের সময় এই অঞ্চলের নৌপথগুলো বিশেষ ঝুঁকির মুখে পড়ে। ১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধ চলাকালে উভয় পক্ষই বাণিজ্যিক ট্যাংকার লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছিল, যা ‘ট্যাংকার যুদ্ধ’ নামে পরিচিত। সেই অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে সতর্ক করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাত ও আঞ্চলিক উত্তেজনার কারণে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে নিরাপত্তা ঝুঁকি বৃদ্ধি পেয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নির্দেশনাকে প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। নৌচলাচল বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্দিষ্ট নৌপথ অনুসরণ এবং সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এড়িয়ে চললে জাহাজ ও নাবিকদের নিরাপত্তা বাড়ানো সম্ভব। তবে তারা এটিও উল্লেখ করছেন যে, দীর্ঘমেয়াদে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও কূটনৈতিক সমাধান ছাড়া হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথে নিরাপত্তা ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করা কঠিন।
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের জারি করা নির্দেশনা শুধু তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাই নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রতিফলন হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।


