জাতীয় ডেস্ক
ভোটাধিকার বাংলাদেশের গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলেও, এটি যদি জালিয়াতির মাধ্যমে অপব্যবহার হয়, তবে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা হুমকির মুখে পড়ে। বাংলাদেশে জাল ভোটকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয় এবং আইন অনুযায়ী এর জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।
জাল ভোট হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে প্রকৃত ভোটার স্বেচ্ছায় অংশগ্রহণ করেননি। এটি ঘটে যখন অন্য কেউ ভোটারের নাম ব্যবহার করে ভোট দেয়, ভোটার অনুপস্থিত থাকলেও ব্যালট বা ইভিএমে ভোট পড়ে যায়, কাউকে জোরপূর্বক নির্দিষ্ট প্রতীকে ভোট দিতে বাধ্য করা হয়, অথবা একজন ব্যক্তি একাধিকবার ভোট প্রদান করে। সংক্ষেপে, যেখানে ভোটারের স্বাধীন ইচ্ছা অনুপস্থিত থাকে, সেখানেই জাল ভোটের ঘটনা ধরা পড়ে।
স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে জাল ভোটের অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। এসব অভিযোগ শুধুমাত্র বিরোধী দলের বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও নির্বাচনের প্রতি অনাস্থা তৈরি করেছে। বিশেষ করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলো জাল ভোটের সম্ভাবনা নিয়ে সতর্কতা জ্ঞাপন করেছে।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) জানিয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাল ভোট প্রতিরোধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাৎক্ষণিকভাবে মামলা দায়ের, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির গ্রেপ্তার এবং আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
আইনগত কাঠামো ও শাস্তি
নির্বাচনী আইনে জাল ভোটকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর ৭৩ থেকে ৮৭ অনুচ্ছেদে ভোটকেন্দ্রে বেআইনি আচরণ ও অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। পাশাপাশি ভোটকেন্দ্রে অনধিকার প্রবেশের জন্য সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড ও সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা আরোপ করা যেতে পারে। ভোটের মাঠে দায়িত্বরত নির্বাহী ও বিচারিক হাকিম এসব অপরাধের ক্ষেত্রে শাস্তি নিশ্চিত করবেন।
কী কী কাজ জাল ভোট হিসেবে গণ্য
১. গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর ৭৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো প্রার্থীকে সুবিধা প্রদান বা নির্বাচনী বাধা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী বা অন্য কারো সাহায্য গ্রহণ বা প্ররোচিত করা।
২. ভোট দেওয়ার যোগ্য নন বা অযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে নির্বাচনে ভোট প্রদান করা বা ভোটের জন্য ব্যালট পেপার গ্রহণের চেষ্টা করা।
৩. একই ভোটকেন্দ্রে একাধিকবার ভোট প্রদান করা বা ব্যালট পেপার নেওয়া।
৪. একই নির্বাচনে একাধিক ভোট কেন্দ্রে ভোট প্রদান করা বা ব্যালট পেপার নেওয়া।
৫. ভোট চলাকালে কোনো ভোটকেন্দ্র থেকে ব্যালট পেপার সরানো।
৬. সচেতনভাবে অন্যকে এসব কাজ করতে প্ররোচিত করা বা তার সাহায্য নেওয়া।
জাল ভোট প্রতিরোধের জন্য আইন, প্রশাসনিক তৎপরতা ও নির্বাচন কমিশনের কঠোর নীতি একত্রে কাজ করে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড রোধ করা না গেলে ভোটারদের আস্থা ক্ষুণ্ণ হওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
বাংলাদেশে ভোটাধিকার সংরক্ষণ ও নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সুশৃঙ্খল আইন প্রয়োগ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং কার্যকর তদারকি অপরিহার্য।


