আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে গত দেড় মাসে প্রতিবেশী পাকিস্তান ও ইরান থেকে আফগানিস্তানে ফিরে গেছেন প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার আফগান শরণার্থী। শুক্রবার জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, চলমান প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে এবং ফেরত যাওয়া ব্যক্তিদের মানবিক সহায়তার প্রয়োজন দ্রুত বাড়ছে।
আফগান শরণার্থী সংকটের সূত্রপাত গত শতকের আশির দশকে। সে সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের সামরিক অভিযানের প্রেক্ষাপটে লাখ লাখ আফগান সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তান ও ইরানে আশ্রয় নেন। পরবর্তী সময়ে নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সোভিয়েত বাহিনীর প্রত্যাহার হলেও বিপুলসংখ্যক আফগান শরণার্থী সেসব দেশে থেকে যান। অনেকে শরণার্থী শিবিরে দীর্ঘদিন বসবাসের পর স্থানীয়ভাবে জীবন-জীবিকা গড়ে তোলেন।
তবে ২০২১ সালে আফগানিস্তানে তালেবান পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পরিবর্তন দেখা দেয়। একই সময়ে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি চাপের মুখে পড়ে এবং পাকিস্তানেও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সংকট তীব্র হয়। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৩ সালের শেষ দিকে পাকিস্তান ও ইরান সরকার নিজ নিজ দেশে অবস্থানরত অনিবন্ধিত বা বৈধ কাগজপত্রবিহীন আফগান নাগরিকদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর থেকে ধাপে ধাপে প্রত্যাবাসন কার্যক্রম চলছে।
ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া স্বেচ্ছায় হলেও কিছু ঘটনায় বলপ্রয়োগ বা চাপ প্রয়োগের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সংস্থাটি সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রতি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড ও শরণার্থী সুরক্ষা নীতিমালা অনুসরণ করার আহ্বান জানিয়েছে।
আফগানিস্তানে ফিরে এসব পরিবার নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। দীর্ঘ কয়েক দশক বিদেশে অবস্থানের কারণে অনেকেই নিজ দেশের পূর্বের বাসস্থান, সম্পত্তি বা সামাজিক যোগাযোগ হারিয়ে ফেলেছেন। অধিকাংশের কাছেই বৈধ নাগরিকত্ব বা পরিচয়পত্র সংক্রান্ত নথি নেই, ফলে প্রশাসনিক সেবা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা কর্মসংস্থানে প্রবেশে বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন তারা।
সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তান ও ইরান থেকে ফিরে আসা আফগান পরিবারের প্রায় ৯০ শতাংশের দৈনিক ব্যয়ক্ষমতা গড়ে ৫ মার্কিন ডলারের সমান। এই সীমিত অর্থে খাদ্য, বস্ত্র, ওষুধসহ মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে হচ্ছে। কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত থাকায় বেকারত্ব একটি বড় সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে। তালেবানশাসিত আফগানিস্তানে অর্থনৈতিক কার্যক্রম এখনো পর্যাপ্তভাবে পুনরুদ্ধার হয়নি, ফলে নতুন করে ফিরে আসা মানুষদের শ্রমবাজারে অন্তর্ভুক্ত হওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
ইউএনএইচসিআর তাদের বিবৃতিতে প্রত্যাবর্তনের স্থায়িত্ব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি সম্প্রতি পরিচালিত এক জরিপের উল্লেখ করে জানিয়েছে, অংশগ্রহণকারীদের অনেকে বর্তমান পরিস্থিতিকে অনিশ্চিত হিসেবে বর্ণনা করেছেন। পরিস্থিতি অনুকূল হলে তারা পুনরায় আগের বসবাসের দেশে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারেন বলে জানিয়েছেন অনেকে।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো মনে করছে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে আফগানিস্তানের ওপর মানবিক ও অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়াতে পারে। পর্যাপ্ত সহায়তা ও পুনর্বাসন কর্মসূচি না থাকলে দারিদ্র্য, খাদ্যসংকট ও অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে ইউএনএইচসিআর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি সহায়তা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছে, যাতে প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া মানবিক ও টেকসইভাবে পরিচালিত হয় এবং ফেরত যাওয়া পরিবারগুলো ন্যূনতম জীবনযাত্রার মান বজায় রাখতে পারে।


