অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে ১৩০ আইন প্রণয়ন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ভারসাম্যপূর্ণ: প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর

অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে ১৩০ আইন প্রণয়ন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ভারসাম্যপূর্ণ: প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর

জাতীয় ডেস্ক

অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর গত ১৮ মাসে প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি সংস্কারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে ভারসাম্যপূর্ণ হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর। সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের এক বিবৃতিতে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, দীর্ঘ সময়ের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও শাসনসংকট কাটিয়ে গণতান্ত্রিক ভিত্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে।

বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট পরিস্থিতির মধ্যে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। দায়িত্ব গ্রহণের সময় রাষ্ট্র অর্থনৈতিক চাপ, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং আর্থিক খাতে অস্থিরতার মুখে ছিল। ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম, ঋণ খেলাপি বৃদ্ধি ও অর্থপাচারের অভিযোগ, প্রশাসনিক কাঠামোয় দুর্নীতি এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আস্থাহীনতা—এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।

এই প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একাধিক সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। কমিশনগুলোর সুপারিশের ভিত্তিতে এবং সরকারের নিজস্ব উদ্যোগে বিভিন্ন আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কার্যক্রম শুরু হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, গত ১৮ মাসে নতুন ও সংশোধনী মিলিয়ে প্রায় ১৩০টি আইন প্রণয়ন এবং ৬০০টিরও বেশি নির্বাহী আদেশ জারি করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৮৪ শতাংশ কার্যকর করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। এসব পদক্ষেপের উদ্দেশ্য ছিল প্রশাসনিক জবাবদিহিতা বৃদ্ধি, আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা আনা এবং সুশাসনের ভিত্তি শক্তিশালী করা।

অর্থনীতির ক্ষেত্রে ব্যাংকিং তদারকি জোরদার, ৪২টি মন্ত্রণালয়ে সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য প্রকাশে স্বাধীনতা নিশ্চিত করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সরকার মনে করছে, এসব পদক্ষেপ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় আস্থা পুনরুদ্ধারে সহায়ক হবে।

পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও কয়েকটি অগ্রগতির কথা তুলে ধরা হয়েছে। জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তির আওতায় প্রায় ৭ হাজার ৪০০টি বাংলাদেশি পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা পেয়েছে বলে জানানো হয়। চীনের সঙ্গে সহযোগিতার অংশ হিসেবে ঋণের মেয়াদ বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বন্যা পূর্বাভাস ব্যবস্থার উন্নয়ন কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে কিছু পণ্যে শুল্কহার ৩৭ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশে নামানো হয়েছে বলে বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পারস্পরিক সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানানো হয়।

আইন-শৃঙ্খলা ও বিচারব্যবস্থায় সংস্কারের বিষয়েও বিবৃতিতে তথ্য দেওয়া হয়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ১ হাজার ২০০-র বেশি কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং মানবাধিকারভিত্তিক প্রশিক্ষণ চালু করা হয়েছে। র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের পুনর্গঠন করে ‘স্পেশাল ইন্টারভেনশন ফোর্স’ নামে নতুন কাঠামো গঠনের কথা বলা হয়। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা জোরদার, মেধাভিত্তিক বিচারপতি নিয়োগ এবং নির্বাহী হস্তক্ষেপ কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক মামলার প্রত্যাহার এবং বন্ধ থাকা কিছু গণমাধ্যম পুনরায় চালুর কথাও বিবৃতিতে রয়েছে।

সরকারের দাবি, এসব সংস্কার একটি নাগরিকবান্ধব প্রশাসনিক কাঠামো গঠনের প্রাথমিক ধাপ। তবে দীর্ঘ সময়ের কাঠামোগত সমস্যার সমাধান স্বল্প সময়ে সম্ভব নয় বলেও স্বীকার করা হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৬ বছরের প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষতি ১৮ মাসে পূরণ করা সম্ভব নয়, তবে রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক কাঠামো শক্তিশালী করার পথে অগ্রসর হচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ঘোষিত সংস্কারগুলোর কার্যকারিতা ও স্থায়িত্ব নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক ঐকমত্যের ওপর। আগামী সময়েই এসব উদ্যোগের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব স্পষ্ট হবে।

জাতীয় শীর্ষ সংবাদ