পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে পৃথক বোমা হামলা ও গোলাগুলিতে প্রাণহানি, নিরাপত্তা পরিস্থিতি উদ্বেগজনক

পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে পৃথক বোমা হামলা ও গোলাগুলিতে প্রাণহানি, নিরাপত্তা পরিস্থিতি উদ্বেগজনক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে সোমবার পৃথক দুটি বোমা হামলা এবং নিরাপত্তা বাহিনী ও সন্ত্রাসীদের মধ্যে গোলাগুলিতে অন্তত ১১ জন নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও এক শিশুসহ তিনজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় আরও অন্তত ২৫ জন আহত হয়েছেন। সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

সোমবার সন্ধ্যায় খাইবার পাখতুনখোয়ার উপজাতীয় জেলা বাজাউরে একটি গুরুতর আত্মঘাতী বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের বরাতে জানা যায়, এক আত্মঘাতী হামলাকারী বিস্ফোরকবোঝাই একটি গাড়ি নিয়ে একটি ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রবেশের চেষ্টা করে। এ সময় গাড়িটি প্রতিষ্ঠানের দেয়ালে ধাক্কা দিলে সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরণ ঘটে। এতে প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে দায়িত্বরত আটজন পুলিশ ও ফ্রন্টিয়ার কোরের সদস্য নিহত হন। একই ঘটনায় অন্তত ১০ জন আহত হন।

বিস্ফোরণের তীব্রতায় আশপাশের কয়েকটি আবাসিক ভবনের ছাদ ধসে পড়ে। এতে এক শিশু প্রাণ হারায়। আহতদের স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

এদিন আরেকটি হামলার ঘটনা ঘটে খাইবার পাখতুনখোয়ার বান্নু শহরে। মিরিয়ান থানার কাছে একটি রিকশায় রাখা বোমা বিস্ফোরিত হলে ঘটনাস্থলেই দুইজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। এ ঘটনায় অন্তত ১৭ জন আহত হয়েছেন। স্থানীয় প্রশাসন এলাকাটি ঘিরে রেখে তদন্ত শুরু করেছে।

এ ছাড়া প্রদেশের শাংলা জেলায় পৃথক এক তল্লাশি অভিযানের সময় পুলিশ ও সন্ত্রাসীদের মধ্যে গোলাগুলি হয়। এতে তিনজন পুলিশ সদস্য এবং তিনজন সন্ত্রাসী নিহত হন। খাইবার পাখতুনখোয়া পুলিশের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, নিহত সন্ত্রাসীরা চীনা নাগরিকদের লক্ষ্য করে হামলার পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত ছিল।

খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশ দীর্ঘদিন ধরেই নিরাপত্তাজনিত অস্থিরতার মুখে রয়েছে। আফগানিস্তানের সীমান্তসংলগ্ন এই অঞ্চলটিতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সশস্ত্র বিদ্রোহ ও জঙ্গি তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী দক্ষিণ ও উত্তরাঞ্চলের সীমান্তবর্তী এলাকায় এসব সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে।

চলতি মাসের শুরুতে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের একটি শিয়া মসজিদে বড় ধরনের আত্মঘাতী হামলার দায় স্বীকার করে ইসলামিক স্টেট (আইএস)। ওই হামলায় কমপক্ষে ৩১ জন নিহত এবং ১৬৯ জন আহত হন। দেশজুড়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক হামলাগুলো পাকিস্তানে চীনা স্বার্থকে লক্ষ্য করে পরিচালিত সহিংসতার ধারাবাহিকতার অংশ। গত কয়েক বছরে চীন পাকিস্তানে অবকাঠামো, জ্বালানি ও পরিবহন খাতে কয়েক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হলেও কিছু এলাকায় স্থানীয় জনগণের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়াও দেখা গেছে। এর ফলে চীনা নাগরিক ও তাদের সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলো প্রায়ই সন্ত্রাসী হামলার লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে।

গত বছরের মার্চ মাসে করাকোরাম হাইওয়েতে একটি বড় বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পে কর্মরত পাঁচজন চীনা নাগরিক ও তাদের স্থানীয় চালক আত্মঘাতী হামলায় নিহত হন। হামলার সময় বিস্ফোরণে তাদের বহনকারী গাড়িটি পাহাড়ি সড়ক থেকে গভীর খাদে পড়ে যায়।

পাকিস্তানের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র চীন বিভিন্ন সময়ে দেশটির অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় আর্থিক সহায়তা দিয়ে আসছে। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (সিপিইসি) প্রকল্পের আওতায় পরিবহন নেটওয়ার্ক, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যাপক বিনিয়োগ করা হচ্ছে, যা চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

খাইবার পাখতুনখোয়া পুলিশের বিবৃতিতে বলা হয়, শাংলা ও আশপাশের এলাকা ঐতিহাসিক সিল্ক রোডের নিকটবর্তী হওয়ায় এটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো এই অঞ্চলের সড়ক করিডর ও উন্নয়ন প্রকল্পকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হুমকি সৃষ্টি করছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাউন্টার টেররিজম ডিপার্টমেন্ট (সিটিডি) ও জেলা পুলিশ যৌথভাবে সমন্বিত অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ