আন্তর্জাতিক ডেস্ক
সিরিয়ার একটি শরণার্থী শিবির থেকে ৩৪ জন অস্ট্রেলীয় নাগরিককে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়ার মধ্যে একজনের ওপর সাময়িক ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে অস্ট্রেলিয়া সরকার। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আপাতত দেশে প্রবেশ করতে পারবেন না বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। সরকারের দাবি, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থ বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক এক বিবৃতিতে বলেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সাময়িকভাবে দেশে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার সিদ্ধান্ত জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত তথ্যের ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারের কাছে এমন তথ্য রয়েছে যা থেকে ধারণা করা হচ্ছে, ওই ব্যক্তি দেশে ফিরলে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
২০১৯ সালে অস্ট্রেলিয়া একটি বিশেষ আইন প্রণয়ন করে, যার মাধ্যমে সন্দেহভাজন সন্ত্রাস-সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে জড়িত নাগরিকদের অস্থায়ীভাবে দেশে ফেরার ক্ষেত্রে বাধা দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। এই আইনের আওতায় কোনো নাগরিককে সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত দেশে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া যেতে পারে। আইনটি মূলত মধ্যপ্রাচ্যে উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ত অস্ট্রেলীয় নাগরিকদের বিষয়ে নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলার লক্ষ্যে প্রণীত হয়।
সংশ্লিষ্ট ৩৪ জন অস্ট্রেলীয় নাগরিক সিরিয়ার একটি শরণার্থী শিবিরে অবস্থান করছেন। তাদের অনেকেই একসময় জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস)-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন অথবা তাদের পরিবারের সদস্য। আইএস ২০১৪ সালে সিরিয়া ও ইরাকের বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখল করে তথাকথিত খেলাফত ঘোষণা করলেও পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক জোট ও স্থানীয় বাহিনীর অভিযানে সংগঠনটি ভূখণ্ড হারায়। এরপর বহু বিদেশি নাগরিক সিরিয়ার বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে আটকা পড়েন।
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ বলেন, দেশে ফেরানোর তালিকায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, এসব শিশুরা তাদের বাবা-মায়ের মতাদর্শিক সিদ্ধান্তের কারণে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে। তবে একই সঙ্গে তিনি জানান, নাগরিকদের দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি বিবেচনার সময় জাতীয় নিরাপত্তা অগ্রাধিকার পাবে।
সিরিয়া থেকে উগ্রপন্থী সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নাগরিক ও তাদের পরিবারকে দেশে ফেরানো নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। একাংশ মনে করে, নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে তাদের ফিরিয়ে আনা উচিত নয়। অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, নাগরিকদের আইনের আওতায় এনে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা এবং শিশুদের পুনর্বাসনের সুযোগ দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। অভিবাসন ও নিরাপত্তা ইস্যুতে কঠোর অবস্থান নেওয়া বিরোধী দলগুলো সরকারের সিদ্ধান্তকে ঘিরে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে জাতীয় নিরাপত্তা ও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ নিয়ে জনমতের গুরুত্ব বিবেচনায় সরকারকে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিতে হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দায়বদ্ধতা ও নাগরিক দায়িত্ব, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা—এই দুইয়ের সমন্বয় করাই অস্ট্রেলিয়া সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাময়িক নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্ত থেকে বোঝা যায়, সরকার প্রত্যেক ব্যক্তির ক্ষেত্রে পৃথকভাবে ঝুঁকি মূল্যায়ন করছে।
সিরিয়ার শরণার্থী শিবিরগুলোতে এখনও বিভিন্ন দেশের বহু নাগরিক অবস্থান করছেন। তাদের প্রত্যাবাসন, বিচার ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক পর্যায়েও একটি জটিল ও সংবেদনশীল ইস্যু হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।


