ট্রাম্পের বৈশ্বিক শুল্কনীতি অবৈধ ঘোষণা, ‘সেকশন ১২২’ আওতায় নতুন ১০ শতাংশ শুল্ক

ট্রাম্পের বৈশ্বিক শুল্কনীতি অবৈধ ঘোষণা, ‘সেকশন ১২২’ আওতায় নতুন ১০ শতাংশ শুল্ক

 

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্যে ভিন্ন ভিন্ন হারে শুল্ক আরোপের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালত। শুক্রবার দেওয়া এক রায়ে আদালত জানায়, আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইন (আইইইপিএ) ব্যবহার করে একতরফাভাবে ব্যাপক শুল্ক আরোপের মাধ্যমে ফেডারেল আইনের সীমা অতিক্রম করা হয়েছে। রায়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্প ‘সেকশন ১২২’ নামে পরিচিত একটি আইনের আওতায় বিশ্বব্যাপী নতুন ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের নির্বাহী আদেশে সই করেন, যা মঙ্গলবার থেকে কার্যকর হওয়ার কথা।

আদালতের রায়ে বলা হয়, সংবিধান অনুযায়ী কর ও শুল্ক নির্ধারণের ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে ন্যস্ত। প্রেসিডেন্ট নির্দিষ্ট আইনগত অনুমোদন ছাড়া এমন বিস্তৃত ও দীর্ঘমেয়াদি শুল্ক আরোপ করতে পারেন না। প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতে উল্লেখ করেন, আইইইপিএতে ‘নিয়ন্ত্রণ’ ও ‘আমদানি’ সম্পর্কিত বিধান থাকলেও তা প্রেসিডেন্টকে সীমাহীন সময়ের জন্য যেকোনো দেশের ওপর যেকোনো হারে শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেয় না।

ছয়জন বিচারক ট্রাম্পের শুল্কনীতির বিপক্ষে রায় দেন। সংখ্যাগরিষ্ঠদের মধ্যে তিনজন উদারপন্থি বিচারকের পাশাপাশি ট্রাম্পের মনোনীত বিচারক অ্যামি কনি ব্যারেট ও নেইল গোরসাচও ছিলেন। ভিন্নমত পোষণ করেন তিন রক্ষণশীল বিচারক—ক্লারেন্স থমাস, ব্রেট কাভানাহ ও স্যামুয়েল আলিতো।

মামলার শুনানিতে কয়েকটি অঙ্গরাজ্য ও ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠান যুক্তি দেয়, আইইইপিএতে ‘ট্যারিফ’ শব্দটির উল্লেখ নেই এবং কংগ্রেস কখনো কর আরোপের মৌলিক ক্ষমতা নির্বাহী বিভাগের কাছে হস্তান্তর করতে চায়নি। আদালত এ যুক্তির সঙ্গে একমত হয়ে জানায়, পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনীতিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে এমন পদক্ষেপে কংগ্রেসের স্পষ্ট অনুমোদন প্রয়োজন।

রায়ের পর ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে বলেন, আদালতের সিদ্ধান্ত মানেই শুল্ক থেকে আদায় করা অর্থ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফেরত যাবে না। বিষয়টি দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিষ্পত্তি হতে পারে। তিনি আরও জানান, শুল্ক কার্যকরের জন্য তার হাতে অন্যান্য আইনি পথও রয়েছে এবং এসব পদক্ষেপ দেশীয় বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়াতে সহায়ক হবে বলে তিনি মনে করেন।

নতুন নির্বাহী আদেশে ‘সেকশন ১২২’ ব্যবহারের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক ১৫০ দিনের জন্য আরোপের সুযোগ রয়েছে। এই সময়ের মধ্যে কংগ্রেস প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে। আদেশে কিছু খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদ, সার, কমলা ও গরুর মাংসের মতো কৃষিপণ্য, ওষুধ, ইলেকট্রনিকস এবং নির্দিষ্ট কিছু গাড়িকে শুল্ক থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তবে ছাড়ের তালিকার পরিধি ও প্রযোজ্যতার বিষয়ে কিছু ক্ষেত্রে স্পষ্টতা নেই।

ইউএসএমসিএর আওতায় কানাডা ও মেক্সিকোর বেশিরভাগ পণ্য নতুন শুল্ক থেকে অব্যাহতি পাবে বলে জানানো হয়েছে। তবে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানান, যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পৃথক বাণিজ্য চুক্তি করেছে, তাদের ক্ষেত্রেও ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ক প্রযোজ্য হবে এবং চুক্তিতে নির্ধারিত হার সাময়িকভাবে স্থগিত থাকতে পারে।

আদালতের রায়ের পর আর্থিক বাজারে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। S&P 500 সূচক প্রায় ০.৭ শতাংশ বেড়ে দিন শেষ করে, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নীতিগত অনিশ্চয়তা হ্রাসের প্রত্যাশার ইঙ্গিত দেয়। তবে শুল্ক ফেরত, সম্ভাব্য রাজস্ব ঘাটতি এবং ভবিষ্যৎ বাণিজ্য নীতির দিকনির্দেশনা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আদালতের এই রায় যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাহী ও আইনপ্রণেতা শাখার ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্বিবেচনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। একই সঙ্গে নতুন শুল্ক আরোপের ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্যে পুনরায় অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। কংগ্রেস ও প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতি কোন পথে অগ্রসর হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে এর প্রভাব কতটা বিস্তৃত হবে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ