বাংলাদেশ নতুন অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে বিপুল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি

বাংলাদেশ নতুন অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে বিপুল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি

 

অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক

নবনিযুক্ত সরকারের জন্য বিদ্যুৎ খাত নতুন অর্থবছরের শুরুতেই বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। দেশি ও বিদেশি বিভিন্ন কোম্পানির কাছে বিপুল অঙ্কের দেনা নিয়ে যাত্রা শুরু হওয়ায় গরম এবং সেচ মৌসুমে চাহিদা অনুযায়ী নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সরকারের জন্য জটিল হয়ে উঠেছে। বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, বর্তমানে দেশজুড়ে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৩ হাজার মেগাওয়াট, যা এই গ্রীষ্মে ১৮ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ করতে গ্যাস, কয়লা ও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কার্যক্রম চালু রাখতে হবে। তিনি বলেন, “পরিস্থিতি সামাল দিতে অর্থ সংস্থান করে ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট করতে হবে। বিদ্যুতের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো বকেয়া ও দেনার পরিমাণ। জ্বালানি আমদানি করতে হবে, যা ফিনান্সিয়াল চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।”

বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে মোট ১৩৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে, যার স্থাপিত উৎপাদন ক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট। দেশে বিদ্যুতের গ্রাহক সংখ্যা ৪ কোটি ৯৪ লাখ। সর্বোচ্চ উৎপাদন রেকর্ড করা হয়েছে ২৩ জুলাই ২০২৫ সালে, যা ছিল ১৬ হাজার ৭৯৪ মেগাওয়াট।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিদ্যুৎ খাতে দেশি ও বিদেশি কোম্পানির কাছে বকেয়া ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত বেসরকারি কোম্পানিগুলোর হিসাব অনুযায়ী ১৪ হাজার কোটি টাকার বকেয়া রয়েছে। বেসরকারি কোম্পানিরা গত সাত-আট মাস ধরে বিদ্যুতের বিল পাননি। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করীম জানিয়েছেন, বকেয়া ক্রমবর্ধমান ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার ফল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে পিডিবির বকেয়া সাময়িকভাবে কমে গেলেও ২০২৫ সালের জুলাইয়ের পর কোনো বিল পরিশোধ হয়নি।

জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৮৮ শতাংশই গ্যাস, কয়লা এবং তেলের উপর নির্ভরশীল। স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় এলএনজি আমদানি করে চাহিদা পূরণ করতে হয়, তেল ও কয়লা প্রায় সম্পূর্ণ আমদানি নির্ভর। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন মনে করেন, “মূল চ্যালেঞ্জ হবে তেলের জন্য প্রয়োজনীয় ডলার সংস্থান করা এবং কয়লা-এলএনজি আমদানি নিশ্চিত করা।” তিনি আরও বলেন, পুরো বিদ্যুৎ জ্বালানি খাতে প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের প্রয়োজন, যার মধ্যে বিনিয়োগ ও বিদেশি দাতা সহায়তা প্রয়োজন হবে।

বিদ্যুৎ খাতে বকেয়া ও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে নিতে বেসরকারি কোম্পানিগুলোর সংগঠন উল্লেখ করেছে, চার- পাঁচ মাসের মধ্যে বকেয়া পরিশোধ না হলে তেল আমদানি ও উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। এলসি খোলার প্রক্রিয়া শেষ হতে ৪০-৪৫ দিন সময় লাগে, যা গরমে চাহিদা পূরণে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়া পিডিবি বেসরকারি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে সময়মতো বিদ্যুৎ দিতে না পারায় এলডি বা লিকুইডিটি ড্যামেজ ধার্য করেছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় বহুমাত্রিক কৌশল গ্রহণ প্রয়োজন। এর মধ্যে বিদ্যুতের দাম সমন্বয়, তেলভিত্তিক কেন্দ্রের ব্যবহার সীমিত করা, লোডশেডিং সমন্বয় এবং তেলের আমদানি প্রক্রিয়া দ্রুত করা অন্তর্ভুক্ত।

নবনিযুক্ত মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, রমজান ও গ্রীষ্ম মৌসুমে মানুষের কষ্ট কমাতে বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত রাখা প্রধান অগ্রাধিকার। গ্যাস, কয়লা এবং এলএনজির যোগান নিশ্চিত করার পাশাপাশি বকেয়া পরিশোধে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। তিনি বলেন, “তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো স্ট্যান্ডবাই থাকবে, জরুরি প্রয়োজনে চালানো হবে, এরপর দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দিকে মনোনিবেশ করা হবে। সর্বোচ্চ চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াটের মতো হতে পারে এবং তা পূরণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।”

বিদ্যুৎ খাতের সাবেক জ্বালানি উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলম বলছেন, তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে অনিয়ম ও দুর্নীতি বিদ্যুৎ সংকটের একটি মূল কারণ। তিনি মনে করেন, কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবহার বৃদ্ধি করে এবং তেলভিত্তিক কেন্দ্র সীমিত করে সরকারের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় হ্রাস করতে পারবে। তবে তেলের সম্পূর্ণভাবে প্রতিস্থাপন বর্তমানে সম্ভব নয়, কারণ চাহিদার শীর্ষে কিছু পরিমাণ তেল ভিত্তিক উৎপাদন অপরিহার্য।

সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে ইতিমধ্যেই ‘ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট’ প্রক্রিয়া হাতে নিয়েছে এবং জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে গ্রীষ্ম মৌসুমে বিদ্যুতের সাপ্লাই নিশ্চিত করার পরিকল্পনা করছে।

অর্থ বাণিজ্য শীর্ষ সংবাদ