ধর্ম ডেস্ক
রমজান মাস কেবল একটি ধর্মীয় মাস নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, সংযম ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সুযোগ হিসেবে বিবেচিত। ইসলামের প্রবর্তক মহানবী মুহাম্মদ (সা.) এই মাসকে সর্বোত্তমভাবে কাটানোর জীবন্ত দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁর রমজানের কার্যক্রম ছিল সুশৃঙ্খল, ভারসাম্যপূর্ণ এবং গভীর আধ্যাত্মিকতায় ভরপুর, যেখানে ইবাদত, পারিবারিক দায়িত্ব, সমাজসেবা ও আত্মসংযমের সমন্বয় লক্ষ্য করা যায়।
নবী মুহাম্মদ (সা.) প্রতিদিন সাহরির মাধ্যমে রমজানের কার্যক্রম শুরু করতেন। ফজরের অল্প আগে সাহরি গ্রহণ করতেন, কখনও স্ত্রীদের সঙ্গে কখনও সাহাবিদের সঙ্গে। সাধারণভাবে খেজুর বা অল্প আহার ও পানি গ্রহণ করা হত। বুখারিতে উল্লেখ আছে, তিনি বলেছেন, “তোমরা সাহরি খাও; কারণ সাহরিতে বরকত আছে।”
দিনের বেলায় নবী (সা.) মসজিদে গিয়ে ফরজ নামাজ আদায় করতেন এবং সাহাবিদের ইমামতি করতেন। তিনি পারিবারিক দায়িত্বকেও গুরুত্ব দিতেন; ঘরে স্ত্রীদের কাজের মধ্যে সহযোগিতা করতেন, নিজের কাপড় সেলাই করতেন এবং ছাগলের দুধ দোহন করতেন। আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, “তিনি ঘরের কাজে সাহায্য করতেন; আর নামাজের সময় হলে মসজিদে যেতেন।” এ তথ্য থেকে প্রতীয়মান হয় যে রমজানের ইবাদত মানে সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া নয়, বরং দায়িত্ব ও ইবাদতের ভারসাম্য রক্ষাই মূল শিক্ষা।
মাগরিবের আগে নবী (সা.) খেজুর বা পানি দিয়ে ইফতার করতেন। হাদিসে বর্ণিত আছে, তিনি পাকা খেজুর দিয়ে ইফতার করতেন; তা না থাকলে শুকনা খেজুর বা কয়েক চুমুক পানি গ্রহণ করতেন। ইফতারের পর মাগরিবের নামাজ আদায় করতেন এবং পরে বাড়িতে সুন্নত নামাজ পড়তেন।
এশার সময় তিনি প্রথমে বাড়িতে সুন্নত নামাজ আদায় করতেন, তারপর মসজিদে জামাতে ইমামতি করতেন। তিন দিনের জন্য নববীতে তারাবি নামাজ পড়ার পর তা বন্ধ করে দেন, যাতে তা উম্মতের জন্য ফরজ হয়ে না যায়। পরবর্তীতে খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) সাহাবিদের জন্য মসজিদে তারাবি নামাজের ব্যবস্থা করেন।
রমজানের রাত নবীর ইবাদতের সময় ছিল। দীর্ঘ কিয়ামুল লাইল, গভীর তিলাওয়াত এবং দোয়ায় রাত কেটে যেত। বিতর নামাজের আগে তিনি অল্প সময় ঘুমাতেন এবং তারপর জেগে বিতর আদায় করতেন। বুখারিতে উল্লেখ আছে, “যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমজানে রাত জাগে (কিয়াম করে), তার আগের গুনাহ ক্ষমা করা হয়।”
রমজানকে কোরআনের মাস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নবী (সা.) পবিত্র কোরআনের তিলাওয়াত ও অধ্যয়ন করতেন। জিবরাইল (আ.) প্রতি রমজানে কোরআন তিলাওয়াতে তাঁর সঙ্গে আসতেন। এ মাসে তাঁর দানশীলতা বিশেষভাবে বৃদ্ধি পেত। ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, রমজানে নবীর দান-সদকা প্রবাহিত বাতাসের মতো দ্রুত সবার কাছে পৌঁছাত।
রমজানের শেষ দশকে তিনি ইবাদতের তীব্রতা বৃদ্ধি করতেন। ইতিকাফে নিয়োজিত হতেন এবং পরিবারের সদস্যদেরও জাগিয়ে দিতেন। আয়েশা (রা.) উল্লেখ করেন, “শেষ ১০ দিনে তিনি কোমর বেঁধে ইবাদতে লেগে যেতেন, রাত জাগতেন এবং পরিবারকে জাগাতেন।” বিশেষ করে লাইলাতুল কদরের সন্ধানে তিনি অধিক জিকির ও দোয়ায় মগ্ন থাকতেন এবং মুসলিম উম্মতের জন্য লাইলাতুল কদরের দোয়া পড়ার নির্দেশ দিতেন।
এভাবে নবী মুহাম্মদ (সা.) রমজান মাসে ইবাদত, দান, পারিবারিক দায়িত্ব ও আত্মসংযমের সুন্দর ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর জীবনচর্চা মুসলমানদের জন্য রমজানকে সার্থক ও ফলপ্রসূভাবে কাটানোর নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত।


